আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত যদি আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ ধাক্কা আনতে পারে—এমনই সতর্কবার্তা দিলেন কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী Saad Sherida Al-Kaabi। তাঁর মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুতর বিঘ্নের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলি বাধ্য হয়ে সরবরাহ বন্ধ করে ফোর্স মাজ্যর (force majeure) ঘোষণা করতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র Financial Times-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাবি বলেন, সংঘাত চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ জ্বালানি উৎপাদকই তাদের সরবরাহ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হবে। তাঁর ভাষায়, “যারা এখনও ফোর্স মাজ্যর ঘোষণা করেনি, আমরা আশা করছি পরিস্থিতি যদি এমনই থাকে, কয়েক দিনের মধ্যেই তারাও তা করতে বাধ্য হবে।”

তিনি সতর্ক করেন, যদি এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলি সরবরাহ বন্ধ না করে, তবে পরে চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারলে তাদের আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।

এই সতর্কবার্তা আসে এমন সময়ে যখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিকারক দেশ কাতার ইতিমধ্যেই একটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের বৃহত্তম এলএনজি শিল্পকেন্দ্র Ras Laffan Industrial City। হামলার পরেই কাতার সরকার জরুরি ভিত্তিতে ফোর্স মাজ্যর ঘোষণা করে।

কাবি জানান, হামলায় ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে তা এখনও পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায়নি। এমনকি যদি এখনই সংঘাত শেষ হয়, তাহলেও রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, “আমাদের জাহাজগুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। ১২৮টি এলএনজি পরিবাহী জাহাজের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ছয় বা সাতটি জাহাজ কার্গো লোড করার অবস্থায় আছে।”

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে যদি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী  দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে থাকে। পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু প্রণালী দিয়ে বিশ্বে মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

কাবি সতর্ক করে বলেন, যদি ট্যাঙ্কারগুলো নিরাপত্তার কারণে এই জলপথ এড়িয়ে চলতে থাকে, তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৫০ ডলার (১৩, ৭৭২ টাকা) পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়ে ৪০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ-এর কাছাকাছি পৌঁছতে পারে, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের প্রায় চার গুণ।

সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই ওই অঞ্চলে সমুদ্রপথে চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কয়েকটি জাহাজে হামলার অভিযোগ উঠেছে, বীমার খরচ বেড়ে গেছে এবং বহু শিপিং কোম্পানি এই পথ ব্যবহার করতে অনীহা দেখাচ্ছে।

এর পাশাপাশি চলমান সংঘাত কাতারের বিশাল গ্যাস প্রকল্প North Field Expansion Project-এর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের এলএনজি উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ৭৭ মিলিয়ন টন থেকে বাড়িয়ে ১২৬ মিলিয়ন টনে নিয়ে যাওয়া।

কাবি স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের সময়সূচি অনিবার্যভাবেই পিছিয়ে যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত উৎপাদন চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে জ্বালানি ক্ষেত্রের বাইরেও এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কাবির সতর্কবার্তা, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ থাকলে তার অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতির ওপর গুরুতর হতে পারে। তিনি বলেন, “এতে বিশ্বের অর্থনীতিই ধসে পড়তে পারে।”

জ্বালানির পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রোকেমিক্যাল ও সার উৎপাদনের কাঁচামালও রপ্তানি হয়। সেই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বহু শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। ড্রোন হামলার পর সামরিক কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা QatarEnergy তাদের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৯,০০০ কর্মীকে বিভিন্ন অপারেশনাল সাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

কাবি জানিয়েছেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত উৎপাদন আবার শুরু করা হবে না। যদিও তিনি দাবি করেন, এই পরিস্থিতি কাতারের নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, কারণ গ্রাহকরা বুঝবেন যে এটি সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ফল। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে কাতারের জ্বালানি রপ্তানির বিকল্প খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহে দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত বড়।