আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফরাসি বিপ্লবের সেই স্লোগান যেন আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ফিলিপাইনের নেগ্রোস অক্সিডেন্টাল প্রদেশের টোবোসোতে। গত ১৯শে এপ্রিল সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের এক দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন মানুষ, আর ঘরছাড়া হয়েছেন ১৬৮টি পরিবার। কিন্তু এই মৃত্যুকে ঘিরে এখন উত্তাল গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আমেরিকা। কারণ, ফিলিপাইন সেনাবাহিনী যাদের 'কমিউনিস্ট বিদ্রোহী' বলে দাবি করছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, ছাত্রনেতা এবং এমনকি দুজন মার্কিন নাগরিকও।

সেনাবাহিনীর দাবি, নিহতরা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত দল 'নিউ পিপলস আর্মি' বা এনপিএ-র সদস্য এবং তারা এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মারা গেছেন। তবে এই বয়ানকে স্রেফ সাজানো নাটক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে স্থানীয় মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহল। নিহতদের মধ্যে লাইল প্রিজোলেস এবং কাই ডানা-রেনে সোরেম নামে দুজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন, যারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সেবামূলক কাজে সেখানে গিয়েছিলেন। এছাড়া সাংবাদিক আরজে লেডেসমা এবং আলিসা আলানো ও মাউরিন সান্তুয়োর মতো মেধাবী ছাত্রনেতাদের মৃত্যুতে ফিলিপাইনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শোক আর ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে।

আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত নয়জনই ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক—কেউ শিক্ষার্থী, কেউ গবেষক, আবার কেউ নিতান্তই স্থানীয় গ্রামবাসী। এমনকি নিহতদের তালিকায় নাবালকের নামও উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রধান মার্সি ক্রিস্টি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যে অভিযানে সশস্ত্র যোদ্ধা আর সমাজকর্মীদের মধ্যে পার্থক্য করা যায় না, সেটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।

ফিলিপাইনের মানবাধিকার সংগঠন 'কারাপাতান'-এর সাধারণ সম্পাদক ক্রিস্টিনা পালাবে অভিযোগ করেছেন যে, দেশটিতে সরকারের সমালোচনা করলেই তাদের 'কমিউনিস্ট' তকমা দিয়ে এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করাটা একটা নিয়মিত ধরনে পরিণত হয়েছে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা করার যে দায়বদ্ধতা সরকারের ওপর বর্তায়, সেনাবাহিনী তা বারবার বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।

বর্তমানে টোবোসোর এই ট্র্যাজেডি নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে। কারাপাতানসহ বিভিন্ন সংগঠন রাস্তায় নেমে সেনা প্রত্যাহার ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানাচ্ছে। এদিকে আমেরিকার বিভিন্ন শহরেও ফিলিপাইন সরকারকে দেওয়া মার্কিন সামরিক তহবিল বন্ধের দাবিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে মৌন মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

একদিকে যখন টোবোসোর মাটিতে সাধারণ মানুষের রক্ত শুকায়নি, ঠিক সেই সময়েই 'বালিকাতান' নামে ফিলিপাইন ও আমেরিকার মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। এই বৈপরীত্যই এখন সাধারণ মানুষকে বেশি ভাবিয়ে তুলছে—একদিকে বন্ধুত্বের আস্ফালন, অন্যদিকে নিজ দেশের সাধারণ নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন নির্দয় আচরণ। ফিলিপাইন কমিশন অন হিউম্যান রাইটস (সিএইচআর) একটি আলাদা তদন্ত শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু স্বজনহারা পরিবারগুলোর একটাই প্রশ্ন: এই বিচার কি আদেও হবে, নাকি ১৯টি প্রাণ কেবল ফাইলবন্দি একটি সংখ্যা হয়েই থেকে যাবে?