মে দিবসের ভোরে যখন সারা বিশ্বের রাজপথ শ্রমিকদের স্লোগান আর রক্তপতাকায় লাল হয়ে ওঠে, তখন খুব কম মানুষই জানেন যে ভারতে এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই) শহরে।
2
10
আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯২৩ সালের ১ মে ভারতের মাটিতে প্রথমবার পালিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। আর এই ঐতিহাসিক ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁকে দক্ষিণ ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট বলা হয়— মালয়পুরম সিঙ্গারাভেলু, যিনি পরিচিত ছিলেন 'সিঙ্গারাভেলার' নামে।
3
10
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতীয় শ্রমিকরা অমানবিক পরিবেশে কলকারখানায় কাজ করতে বাধ্য হতেন, তখন থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে দানা বাঁধছিল অসন্তোষ। ১৯১৮ সালে মাদ্রাজে ভারতের প্রথম সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন ‘মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন’ গঠিত হওয়ার পর শ্রমিক আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়।
4
10
ভি. ও. চিদাম্বরন পিল্লাইয়ের মতো নেতারা আগেই তুতিকোরিন ও তিরুনেলভেলি অঞ্চলে ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোম্পানির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের খেপিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এই লড়াইকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আদর্শিক রূপ দেওয়ার কারিগর ছিলেন সিঙ্গারাভেলার।
5
10
পেশায় আইনজীবী এবং আদর্শে সমাজতন্ত্রী এই মানুষটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল জাতীয়তাবাদ দিয়ে শ্রমিকের পেটের খিদে মিটবে না। ১৯২৩ সালের সেই ১ মে মাদ্রাজের দুই প্রান্তে দুটি বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন তিনি। একটি হয়েছিল বর্তমান মেরিনা বিচে হাইকোর্টের সামনে, আর অন্যটি তিরুভানমিয়ুর সমুদ্রতটে।
6
10
সেদিনই ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার শ্রমিকরা লাল পতাকার নিচে সমবেত হয়েছিলেন। সিঙ্গারাভেলার স্বহস্তে লাল পতাকাটি উত্তোলন করেন, যার কেন্দ্রে ছিল একটি গিয়ার ও কাস্তে হাতে ধরা একটি হাতের প্রতীক। সেই পতাকায় খোদাই করা ছিল এক কালজয়ী আহ্বান— ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও’।
7
10
মেরিনা বিচের সেই সমাবেশেই তিনি ভারতের প্রথম শ্রমিক-কৃষক রাজনৈতিক দল ‘লেবার কিষাণ পার্টি অফ হিন্দুস্থান’-এর ঘোষণা করেন। তিনি দাবি তুলেছিলেন শ্রমিকদের জন্য দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময়সীমা, উপযুক্ত মজুরি এবং ১ মে দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করার।
8
10
সেই সময়ের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। মজার বিষয় হল, সিঙ্গারাভেলার কেবল একজন শ্রমিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ই. ভি. রামস্বামী পেরিয়ারের ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’ বা ‘সেলফ রেস্পেক্ট মুভমেন্ট’-এর অন্যতম কাণ্ডারি। তামিলনাড়ুর কিংবদন্তি নেতা সি. এন. আন্নাদুরাই একবার সিঙ্গারাভেলারকে লেনিন বা ট্রটস্কির সারিতে স্থান দিয়েছিলেন।
9
10
সিঙ্গারাভেলার এবং পেরিয়ার মিলে ১৯৩০-এর দশকে যে ‘সেলফ রেস্পেক্ট সোশালিস্ট মুভমেন্ট’ গড়ে তুলেছিলেন, তা কেবল অধিকারের লড়াই ছিল না, ছিল কুসংস্কার আর শোষণের বিরুদ্ধে এক বৈপ্লবিক অভিযান।
10
10
আজ যখন মে দিবসের মিছিলে পা মেলানো হয়, তখন মাদ্রাজের সেই সমুদ্রতট আর সিঙ্গারাভেলারের সেই লাল পতাকার কথা স্মরণ করা জরুরি। কারণ তাঁর হাত ধরেই ভারতের শ্রমিক আন্দোলন এক বিচ্ছিন্ন লড়াই থেকে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, যা আজও এদেশের মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষার প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।