আজকাল ওয়েবডেস্ক: মানুষ নৈতিক হতে গেলে কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করা জরুরি? এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই সমাজ, দর্শন ও ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা দেখাচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই একরকম নয়। বরং সমাজের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আধুনিকতার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়।

২০২৫ সালে ২৫টি দেশে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় সবাই মনে করেন যে নৈতিক জীবনযাপনের জন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করা জরুরি। সেখানে ৯৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, নৈতিকতা ও ভালো মূল্যবোধের জন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা অপরিহার্য। একই প্রবণতা দেখা গেছে কেনিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশেও। কেনিয়ায় ৯৪ শতাংশ, ভারতে ৮৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে একজন মানুষ সত্যিকারের নৈতিক হতে চাইলে ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা দরকার।

অন্যদিকে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় এক ডজন দেশে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ মনে করেন যে নৈতিক হতে গেলে ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা বাধ্যতামূলক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়াও একজন মানুষ নৈতিক ও সৎ হতে পারেন। পোল্যান্ডে এই হার ৮০ শতাংশ, স্পেনে ৮৪ শতাংশ এবং সুইডেনে ৮৯ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান শুধু একটি ধর্মীয় প্রশ্ন নয়, বরং সমাজের গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রতিফলনও বটে। যেসব দেশে ধর্ম মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের কেন্দ্রে রয়েছে, সেখানে সাধারণত নৈতিকতার সঙ্গে ঈশ্বর বিশ্বাসকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখা হয়। আবার যেসব দেশে সমাজ তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ এবং আধুনিক নাগরিক মূল্যবোধ শক্তিশালী, সেখানে মানুষ নৈতিকতার উৎস হিসেবে মানবিক বোধ, আইন এবং সামাজিক দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এই বাস্তবতাকে অনেকেই একটি কৌতুকপূর্ণ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ তুলনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। বলা হয়, যদি ধরেই নেওয়া যায় যে ঈশ্বর নিজেই একদিন পৃথিবীতে নেমে এসে একটি নির্বাচন লড়লেন, তাহলে ফলাফল সম্ভবত খুব ভিন্ন হবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে—যেখানে ধর্ম সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে—সেখানে তিনি সম্ভবত বিপুল ভোটে জয়ী হতেন। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া বা নাইজেরিয়ার মতো দেশে মানুষের বৃহৎ অংশ যে ঈশ্বর বিশ্বাসকে নৈতিকতার ভিত্তি বলে মনে করেন, তা সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু একই নির্বাচন যদি ইউরোপের বহু দেশ বা উত্তর আমেরিকার কিছু অংশে অনুষ্ঠিত হত, তাহলে হয়তো ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হত। সেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং সামাজিক নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে ধর্মের প্রভাব কমেছে। ফলে সেই কাল্পনিক নির্বাচনে ঈশ্বর সম্ভবত কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তেন, এমনকি বড় ধরনের পরাজয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যেত না।এই তুলনা অবশ্যই রূপক, কিন্তু এর মধ্যেই ধরা পড়ে বিশ্বজুড়ে ধর্ম ও নৈতিকতার সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতা।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিবর্তন গত দুই দশকে খুব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ২০০২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ১৮ বার আমেরিকানদের কাছে এই প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রথম দিকের সমীক্ষাগুলিতে দেখা গিয়েছিল, আমেরিকানরা প্রায় সমানভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ মনে করতেন ঈশ্বরবিশ্বাস নৈতিকতার জন্য অপরিহার্য, আবার কেউ মনে করতেন তা নয়।

কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে প্রবণতা বদলাতে শুরু করে। সেই সময়ের পর থেকে ক্রমশ বেশি মানুষ বলতে শুরু করেন যে নৈতিক হতে গেলে ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ২০২০ সালের পর থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এই মতের সঙ্গে একমত।

বিশ্বের আরও বহু দেশেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত তিন বছরে, অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১১টি দেশে এই ধারণার সমর্থন কমেছে যে নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরবিশ্বাস অপরিহার্য। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা বলা যায়। ২০২২ সালে সেখানে ৩৭ শতাংশ মানুষ মনে করতেন নৈতিক হতে ঈশ্বরে বিশ্বাস দরকার। ২০২৫ সালে সেই হার নেমে এসেছে ২১ শতাংশে।

তবে সব দেশে এই প্রবণতা একরকম নয়। কিছু দেশে এই ধারণা অপরিবর্তিত রয়েছে, আবার কোথাও কোথাও তা বেড়েছে। যেমন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ঈশ্বরবিশ্বাস ও নৈতিকতার সম্পর্কের ধারণা কিছুটা কমেছে। আবার কেনিয়া, মেক্সিকো এবং তুরস্কে মানুষের মতামতে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।

বিশ্বের মধ্যে মাত্র দুটি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারণার সমর্থন বেড়েছে—ভারত এবং ইন্দোনেশিয়া। ভারতে ২০১৯ সালে ৭৯ শতাংশ মানুষ মনে করতেন নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরবিশ্বাস জরুরি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ শতাংশে। আরও পিছিয়ে গেলে দেখা যায়, ২০১৩ সালে এই হার ছিল ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এক দশকের মধ্যে ভারতে এই ধারণার সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সমীক্ষা আরও দেখায়, ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের মতামতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যারা নিজেদের জীবনে ধর্মকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তারা সাধারণত নৈতিকতার সঙ্গে ঈশ্বর বিশ্বাসকে বেশি জুড়ে দেখেন। যেমন হাঙ্গেরিতে যারা বলেছেন ধর্ম তাদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাদের দুই-তৃতীয়াংশ মনে করেন নৈতিক হতে ঈশ্বরে বিশ্বাস জরুরি। কিন্তু যারা ধর্মকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, তাদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ এই মতের সঙ্গে একমত।

সব মিলিয়ে এই সমীক্ষা দেখায়, নৈতিকতা ও ধর্মের সম্পর্ক বিশ্বজুড়ে একরৈখিক নয়। কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাসকে নৈতিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়, আবার কোথাও মানুষ বিশ্বাস করেন যে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধই নৈতিকতার প্রকৃত উৎস। এই ভিন্নতার মধ্যেই ফুটে ওঠে আধুনিক বিশ্বের একটি বড় সত্য—নৈতিকতার ধারণা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে।