আজকাল ওয়েবডেস্ক: পর্যটকদের কীভাবে আকর্ষণ করতে হয়, জাপান সেই শিল্পে অনেক আগেই পারদর্শী হয়ে উঠেছে। টোকিও পর্যটকদের মুগ্ধ করে এবং কিয়োটো প্রশান্তি এনে দেয়। কিন্তু ইদানীং পর্যটকরা প্রচলিত পর্যটন কেন্দ্রের বাইরের অন্যান্য স্থান সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
জাপানের আগ্নেয়গিরির উপত্যকা, গ্রামীণ রেল স্টেশন এবং লোকগাঁথার সঙ্গে জড়িত খাবার এখন বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এমনই একটি স্থান হল ওয়াকুদানি। হাকোনের একটি বাষ্পীয় আগ্নেয়গিরি উপত্যকা, যেখানে বাতাসে সালফারের তীব্র গন্ধ ভেসে বেড়ায়, সাদা ডিম কালো হয়ে যায় এবং সেই ডিম খেলে আপনার আয়ু সাত বছর বেড়ে যাবে!
শুনে মনে হবে এটি সমাজমাধ্যমের জন্য তৈরি করা কোনও গল্প। কিন্তু ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং বাকেট লিস্টের অস্তিত্বের অনেক আগে থেকেই ওয়াকুদানি বছরের পর বছর ধরে কৌতূহলী পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে এই ডিমের গল্প শুনিয়েই।
টোকিও থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে হাকোনে অঞ্চলে অবস্থিত ওয়াকুদানি। সহজেই একদিনে ভ্রমণের উপযুক্ত। এখানে পৌঁছনোর পথটিও অনন্য অভিজ্ঞতা দেবে পর্যটকদের। মধ্য টোকিও থেকে পর্যটকরা সাধারণত ওদাওয়ারা পর্যন্ত ট্রেনে যান। তারপর হাকোনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় পরিবহনের এক প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ওয়াকুদানি পৌঁছন। স্থানীয় পরিবহনের মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি ট্রেন, কেবল কার এবং সবশেষে হাকোনে রোপওয়ে। যা সরাসরি আগ্নেয়গিরির উপত্যকার উপর দিয়ে চলাচল করে। রোপওয়ে ওয়াকুদানি স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছলে প্রাকৃতিক দৃশ্য নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বনভূমি আচ্ছাদিত ঢাল সরে গিয়ে পাথুরে ভূখণ্ড চোখে পড়ে, মাটির ফাটল থেকে সাদা বাষ্প উঠতে থাকে এবং সালফারের হাল্কা গন্ধ জানান দেয় যে আপনি গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছেন।
‘ওওয়াকুদানি’-র বাংলা অর্থ ‘মহা ফুটন্ত উপত্যকা’। হাকোনে পর্বতের অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্রায় তিন হাজাপ বছর আগে গঠিত হওয়া এই এলাকাটিতে এখনও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। মাটি থেকে হিসহিস শব্দ হয়, ফাটল দিয়ে গরম গ্যাস নির্গত হয় এবং উপত্যকা জুড়ে অবিরাম বাষ্পের মেঘ ভেসে বেড়ায়। এই কারণে এটিকে ‘নরক উপত্যকা’ বা ‘মৃত্যু উপত্যকা’ বলা হয়। কিন্তু এই আগ্নেয়গিরির শক্তি থেকেই তৈরি হয় বিশেষ খাদ্যপণ্য ‘কুরো-তামাগো’ বা কালো ডিম।
দেখতে কালো হলেই এটি আদতে সাধারণ মুরগির ডিম। এগুলিকে ওয়াকুদানির সালফার-সমৃদ্ধ উষ্ণ প্রস্রবণে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সেদ্ধ করা হয়। জলের খনিজ পদার্থ ডিমের খোসার লোহার সঙ্গে বিক্রিয়া করে। এর ফলে ডিমের খোসা কুচকুচে কালো হয়ে যায়। খোলসের ভিতরে ডিমে কোনও পার্থক্য থাকে না। শুধু একটু সালফারের গন্ধ থাকে।
কালো ডিমের গল্পের শুরু হাজার বছর আগে। স্থানীয় লোকগাঁথা অনুযায়ী, কোবো দাইশি বা কুকাই বহু বছর আগে এই বিপজ্জনক উপত্যকায় এসেছিলেন। বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অস্থিতিশীল ভূমির কাছে বসবাসকারী স্থানীয়দের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে তিনি এনমেই জিজো-র মূর্তি খোদাই করেছিলেন। যিনি দীর্ঘায়ু ও সুরক্ষার প্রতীক। কোবো স্থানীয় বাসিন্দাদের উষ্ণ প্রস্রবণে সেদ্ধ ডিম খেতে উৎসাহিত করতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল এর ফলে স্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বৃদ্ধি হবে। সময়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে যে, একটি কালো ডিম খেলে আয়ু সাত বছর বেড়ে যায়।
জাপানি সংস্কৃতিতে সাত সংখ্যাটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এই সংখ্যাটি প্রায়শই সৌভাগ্য এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জড়িত। যদিও এই দাবির কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
