আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্যারিস থেকে প্রায় ১৩০ মাইল পশ্চিমে, ফ্রান্সের ছোট্ট শহর আলঁসোঁ। সেখানকার রেলস্টেশনের বাইরে এক শীতল সকালে অপেক্ষা করছিলেন ৬৫ বছর বয়সী এক ফরাসি ব্যক্তি মাথায় কালো বোলার হ্যাট, ঘন সাদা দাড়ি, লালচে মুখ, আর চোখে অদ্ভুত এক শিশুসুলভ কৌতূহল। নাম তাঁর ক্রিশ্চিয়ান পঁশেভাল। বিশ্বমাধ্যমে যিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন এক আজব আবিষ্কারের জন্য এমন একটি বড়ি, যা নাকি মানুষের বাৎক্রমকে দুর্গন্ধহীন, এমনকি চকলেট, গোলাপ বা ভায়োলেটের মতো সুগন্ধি করে তোলে।
এই ‘ফার্ট পিল’ বা ফরাসি ভাষায় ‘পিল্যুল পে’ (Pilule Pet) প্রথম দেখায় অনেকের কাছেই রসিকতা বা ঠাট্টা মনে হতে পারে। ওয়েবসাইটের রঙিন বিজ্ঞাপন, মজার ট্যাগলাইন সব মিলিয়ে যেন নতুন বছরের উপহারের দোকানে রাখা কোনও প্র্যাঙ্ক আইটেম। কিন্তু পঁশেভালের সঙ্গে সময় কাটালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় এই আবিষ্কারের পেছনে আছে লজ্জা, সমাজ, শরীর এবং স্বাধীনতা নিয়ে গভীর এক দার্শনিক ভাবনা।
পঁশেভাল থাকেন নরম্যান্ডি অঞ্চলের গেসভ্র নামের এক গ্রামে, জনসংখ্যা মাত্র ৫৩২। চারদিকে সবুজ মাঠ, ফাঁকা জমি, আর শিল্পহীন হয়ে পড়া গ্রামীণ ফ্রান্সের বিষণ্ন বাস্তবতা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানেই তাঁর বসবাস। ছোট পাথরের কুটির, সামনে আগাছার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ধাতু ও প্লাস্টিক দিয়ে বানানো অদ্ভুত সব ভাস্কর্য দেখলেই বোঝা যায়, এটি একজন সাধারণ মানুষের বাড়ি নয়।
নিজেকে তিনি বলেন ‘বোয়েম’- বাঁধাহীন শিল্পী। জীবনের শুরুর দিকে বাবার সেনা চাকরির কারণে ফ্রান্সের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন। পরে প্যারিসে এসে মেট্রো স্টেশনে গান গেয়ে, ছোটখাটো কাজ করে জীবন চালিয়েছেন। সেখানেই থিয়েটারে পরিচয় হয় ভবিষ্যৎ স্ত্রী এভলিনের সঙ্গে। দু’জনে মিলে গড়ে তোলেন একটি নয়জনের সংগীতদল ‘লে পঁশেভো’। গ্রামীণ কমিউনে থাকা, দেশজুড়ে কনসার্ট সব মিলিয়ে একেবারে হিপি জীবনের ছাপ।
আজ সেই জীবন অনেকটাই শান্ত। প্রশাসনিক দিক থেকে অবসরপ্রাপ্ত পঁশেভাল এখনো থেমে নেই। শিল্প, সংগীত, সমাজ, রাজনীতি সব কিছু নিয়েই তাঁর আগ্রহ অটুট। কথার মাঝেই হঠাৎ চার্লি হেবদো, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বা গ্রামীণ ফ্রান্সের ভাঙন নিয়ে কথা শুরু করে দেন। বসে থাকা যেন তাঁর পক্ষে অসম্ভব- ফায়ার প্লেসে কাঠ ঢোকাতে ঢোকাতে, ঘরে পায়চারি করতে করতেই গল্প বলেন।
আবিষ্কারের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল টয়লেট পেপার দিয়ে। ১৯৯৯ সালে তিনি এমন টয়লেট পেপার বানান, যেখানে খবরের কাগজ ছাপা থাকত। সেই অভিনব ভাবনার জন্য ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘কঁকুর লেপিন’ প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পান। পরে পরিবেশবান্ধব কফি প্যাকেট, বাগানের যন্ত্রের মাল্টি-টুল- একের পর এক অদ্ভুত কিন্তু সৃজনশীল উদ্যোগ নেন। এসব থেকে আসা অর্থের বড় অংশই তিনি দান করেছেন- প্রতিবন্ধীদের সহায়তাকারী কুকুর প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ জুগিয়েছেন অন্তত ১৫টি কুকুরের।
ফার্ট পিলের ভাবনাটা আসে ২০০৪ সালে, এক ভারী নৈশভোজের পর। বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়ার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র গন্ধ তাঁকে ভাবায় কেন এমন একটি স্বাভাবিক শারীরিক ক্রিয়া এত লজ্জার বিষয়? কেন মানুষ টেবিলে বসে পাদ দিলে অপমানিত বোধ করে? তিন মাস ধরে গবেষণা, ফরাসি ল্যাবের সহায়তায় তৈরি হয় বড়ির ফর্মুলা উদ্ভিজ্জ কার্বন, মৌরি এবং প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণ। পঁশেভালের ভাষায়, “আমি টেবিলে বায়ুত্যাগের দেওয়ার সময় মানুষের যে লজ্জা, সেই মানসিক ‘কমপ্লেক্স’টা খুলে দিতে চেয়েছি।”
বিজ্ঞানীরা অবশ্য কিছুটা সন্দিহান। লন্ডনের গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজিস্ট অ্যান্টন ইমানুয়েলের মতে, অন্ত্রের গ্যাসের গন্ধ কিছুটা বদলানো সম্ভব হলেও, একে সুগন্ধি করে তোলা বৈজ্ঞানিকভাবে খুবই সীমিত ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। তবুও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড়ি বিক্রি হু হু করে বেড়েছে। মাত্র ১৫ দিনে ২ হাজারের বেশি অর্ডার এসেছে।
পঁশেভাল অবশ্য এসব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তাঁর কাছে বড়ি একটি পণ্য নয়, একটি শিল্পকর্ম। একটি প্রশ্ন- দুর্গন্ধ না থাকলে, গ্যাস কি আর লজ্জার বিষয় হবে? দুপুরে গ্রামের একমাত্র রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পর তিনি হেসে বলেন, “আমি তো পাতার মতো। বাতাস যেদিকে নিয়ে যায়, আমি সেদিকেই যাই।”
বিকেলে বাড়ি ফিরে গিটার হাতে বসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফেরেন এভলিন। কথা না বলেই গানের সুরে মিশে যান দু’জনে আগুনের পাশে বসে থাকা দুই বৃদ্ধ হিপি প্রেমিক, যাদের জীবন আজও সৃষ্টির আগুনে জ্বলছে। পঁশেভালের আবিষ্কার হয়তো পৃথিবী বদলাবে না। হয়তো অধিকাংশ মানুষের বায়ুত্যাগ আজও আগের মতোই দুর্গন্ধযুক্ত থাকবে। কিন্তু তাঁর জীবন দর্শন পরিষ্কার সব কিছু চেষ্টা করা কখনোই শেষ হয় না।
“আমরা সব চেষ্টা করে ফেলেছি এই কথাটাই অসম্ভব,” তিনি বলেন। “প্রতিদিন সবকিছু নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। আমরা সবাই আসলে মিউট্যান্ট।” প্যারিসে ফেরার সময় তিনি এক বোতল ফার্ট পিল হাতে ধরিয়ে দেন। আমি কয়েকদিন ধরে খাচ্ছি। এখনো চকলেটের গন্ধের অপেক্ষায়।
