আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রকৃতি চমক পছন্দ করে। বিস্ময় পছন্দ করে। সেই বিস্ময়ের মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হল পরিযায়ী পাখি। প্রবল ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে অপেক্ষাকৃত অল্প ঠান্ডার জায়গায় উড়ে যায় পরিযায়ী পাখিরা। প্রতি বছর পৃথিবীর নানা প্রান্তের হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে পরিয়ায়ী পাখিরা নতুন আবাসস্থলে পৌঁছায়। সম্প্রতি এমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব।
বার-টেইলড গডউইট নামে একটি অল্পবয়সী পরিযায়ী পাখি অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ে তুলেছে। বি-সিক্স বলে পরিচিত মাত্র চার মাস বয়সী একটি পাখি, একটানা প্রায় ১৩,৫৬০ কিলোমিটার উড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ল।
আলাস্কা থেকে উড়ে গিয়ে ছোট্ট পাখিটা থেমেছে একেবারে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াতে। এই পুরো যাত্রায় সে সময় নিয়েছে ১১ দিন। এর মাঝে কোথাও সে এক সেকেন্ডের জন্যও থামেনি! সে বিশ্রাম নেয়নি, খায়নি এমনকী জল পর্যন্ত মুখে তোলেনি। এই যাত্রা ইতিহাস গড়েছে। টানা ১১ দিন, না থেমে কোনও প্রাণী এর আগে ওড়েনি। এই যাত্রা পৃথিবীর ইতিহাসে যে কোনও প্রাণীর সবচেয়ে দীর্ঘ নিরবিচ্ছিন্ন আকাশে ওড়া বলে নথিভুক্ত হয়েছে।
এই অসাধারণ যাত্রাপথটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল একটি স্যাটেলাইট ট্যাগের সাহায্যে। ট্যাগটি যুক্ত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে–এর গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে।
এই বার-টেইলড গডউইট একটি বড় আকারের উপকূলীয় পাখি। এরা মূলত সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে। এই প্রজাতি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ননস্টপ বা না থেমে ওড়ার জন্য বিখ্যাত। পাখিগুলি সাধারণত আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে প্রজনন করে। তারপর শীতকালে তারা দক্ষিণ গোলার্ধে চলে যায়। সাধারণত নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় যায় তারা।
আলাস্কা থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১১,০০০ কিলোমিটার। সাধারণত পাখিদের এই যাত্রা সম্পন্ন করতে সময় লাগে প্রায় ৯ দিন। এই কয়েকদিন ওড়ার সময়ে তারা কোথাও থামে না, খায় না, বিশ্রামও নেয় না। প্রশান্ত সাগরের উপর দিয়ে তারা না থেকে শুধুই উড়ে চলে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই পাখিরা ঘণ্টায় প্রায় ৫৫ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম। এই কারণেই বার-টেইলড গডউইটকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও গতিশীল পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম বলে মনে করা হয়।
এত দীর্ঘ পথ এক টানা উড়ে এতখানি পথ পাড়ি দেওয়া সহজ কথা নয়। এর ফলে পাখিদের শরীরে ঘটে নানা জৈবিক পরিবর্তন। যাত্রার আগে পাখিরা প্রচুর খাদ্য গ্রহণ করে। এতে শরীরে বিপুল পরিমাণ চর্বি জমা হয়। বি–সিক্স পাখিটি আলাস্কায় থাকার সময় এত বেশি খাদ্য গ্রহণ করেছিল যে তার শরীরের প্রায় অর্ধেক ছিল চর্বির ওজন। এই চর্বিই ছিল তার প্রধান শক্তির উৎস।
চমক, এখানেই শেষ হচ্ছে এমনটা নয়। ওড়ার সময়ে পাখির শরীরেও পরিবর্তন ঘটে। তারা কিছু অঙ্গের আকার ছোট করে ফেলে। যেমন, পাকস্থলী ও যকৃতের আকার সাময়িকভাবে ছোট হয়ে যায়। এর ফলে শরীরের ওজন কমে। পাশাপাশি শক্তি সঞ্চয় হয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় খাদ্য ও জল ছাড়া আকাশে ভেসে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ দিন ধরে একটাআ ওড়ার জন্য দরকার সঠিক দিকনির্দেশনও। খোলা সমুদ্রের উপর দিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার উড়তে হলে নিখুঁত ন্যাভিগেশন প্রয়োজন। গবেষণায় জানা গিয়েছে, বার-টেইলড গডউইট পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়।
পাখির চোখে বিশেষ ধরনের প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিনের নাম ক্রিপ্টোক্রোম। এই প্রোটিন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এর ফলে পাখিরা সঠিক পথে উড়তে পারে। এই প্রোটিনকে আমরা এক ধরনের প্রাকৃতিক কম্পাসও বলতে পারি। এছাড়াও তারা সূর্যের অবস্থান, নক্ষত্রমণ্ডল এবং কখনও কখনও বিশেষ গন্ধ ব্যবহার করে দিক নির্ণয় করে।
একটানা উড়তে গেলে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এই পাখি বিশ্রামও নেয়। তবে মাটিতে নেমে বিশ্রাম নেয় না। আকাশে, উড়তে থাকা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে নেয়। এই প্রক্রিয়ার নাম ইউনিহেমিস্ফেরিক স্লিপ। এতে পাখির মস্তিষ্কের এক অংশ ঘুমায়। অন্য অংশ জেগে থাকে। ফলে পাখিটি উড়তে পারে। আবার বিশ্রামও পায়। অনেকে এই ঘুমকে এক চোখের ঘুমও বলে থাকে। কারণ, আকাশে ঘুমের সময়ে পাখিরা একটা চোখ খুলে আর একটা চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে নেয়, বা বিশ্রাম নেয়।
ওড়ার সময়ে তারা উচ্চতাও পরিবর্তন করে। মরুভূমির উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা তুলনামূলক বেশি উচ্চতায় উড়ে। এতে তাপ কম লাগে। সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ার সময় তারা অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় উড়ে। এতে বায়ুর প্রবাহ কাজে লাগে। এই কৌশল শক্তি সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলেও ওড়ার সময় এই বার-টেইলড গডউইট পাখিদের দেখা যায়। শীতকালে তারা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সমুদ্রতীরে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এর ফলে ভারতের পাখিবৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হয়। শীত ফুরোলে আবার উড়ে নিজের ঘরে ফিরে যায়।
বি–সিক্স পাখির এই যাত্রা প্রকৃতির অসাধারণ ক্ষমতার এবং বিষ্ময়কর চমকের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। পৃথিবীর পরিযায়ী পাখিরা প্রতি বছর এমন অসাধারণ অভিযানে অংশ নেয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বাসস্থান ধ্বংস এবং পরিবেশ দূষণের কারণে এই পাখিরা ক্রমশ বিপদের মুখে পড়ছে। তাই পরিযায়ী পাখিদের পথ ও আবাসস্থল রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির বিস্ময়কে রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব।
