আজকাল ওয়েবডেস্ক: রবিবার, দীর্ঘ ও নিবিড় আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছেছে। উভয় পক্ষই লেবানন-সহ সব ক্ষেত্রে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং চুক্তিটিকে ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

‘দ্য টাইমস’-এর সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন যে, এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালী ‘চিরতরে টোল-মুক্ত’ থাকবে।

চুক্তির শর্তাবলী তুলে ধরলেন ট্রাম্প
ট্রাম্প জানান, এই চুক্তির ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচল পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে যাতায়াত নিশ্চিত হবে। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আপত্তি সত্ত্বেও এই চুক্তিটি ইজরায়েলকে সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে।

ট্রাম্পের মতে, নেতানিয়াহু আলোচনা প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও সতর্ক করে বলেন যে, এই চুক্তিটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কেবল সূচনা মাত্র।

ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে সতর্কতা
ট্রাম্প বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থতা দেখা দিলে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, আলোচনা ভেস্তে গেলে তিনি হয় তেহরানের ওপর পুনরায় সামরিক হামলা চালাবেন, অথবা ওই অঞ্চলের আয়ের ২০ শতাংশের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু হতে পারে।

খসড়া সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ
ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা জানিয়েছে যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ১৪টি ধারাবিশিষ্ট একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খসড়ায় ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া নথিতে লেবানন-সহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার 'বন্ধু'দের ইরানের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। 

পারমাণবিক আলোচনা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকে পারমাণবিক বিষয়াবলি এবং নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ৬০ দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। খসড়া নথি অনুযায়ী, আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে দেওয়া তাদের সহায়তা- এই বিষয়গুলোকে আলোচনার আওতা-বহির্ভূত রাখা হবে।

নথিতে আলোচনার সময়কালে ইরানের আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ অবমুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চূড়ান্ত আলোচনা শুরুর আগেই ওই অর্থের অর্ধেক অংশ ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ করতে হবে।

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত এই চূড়ান্ত চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

জেনেভায় স্বাক্ষরের পরিকল্পনা
ইরানি সূত্রের খবর অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচি জেনেভা সফরে যাবেন। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি যেতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেনন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।

ভারতের কী লাভ?
হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ শুল্ক ও বিধিনিষেধ মুক্ত হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবহন খরচ অনেকটাই কমবে। এর ফলে সামগ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং ভারতের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি কমবে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। এই জলপথের ওপরই ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির সিংহভাগ নির্ভরশীল। এই রুটটি শুল্কমুক্ত এবং অবাধ হলে ভারতের জন্য যেসব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে তা নিম্নরূপ...

জ্বালানি নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা: মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে (যেমন- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইরাক এবং কুয়েত) নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত জ্বালানি তেল এবং এলএনজি সরবরাহ বজায় থাকে।

অর্থনৈতিক সাশ্রয়: কোনও ট্রানজিট ফি, শুল্ক বা টোল না থাকায় ভারতের তেল আমদানিকারক সংস্থাগুলোর টন প্রতি পরিবহন খরচ কমে, যা দেশের উৎপাদন ক্ষেত্র ও লজিস্টিকসকে প্রতিযোগিতামূলক করে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: তেল ও গ্যাসের আমদানি মূল্য কমলে দেশে পেট্রোল, ডিজেল, সার এবং পরিবহন খরচ স্বাভাবিক থাকে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।