আজকাল ওয়েবডেস্ক: চিলির দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ক্রমেই আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। লাগামছাড়া এই আগুনে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২১ জন, ঘরছাড়া হয়েছেন কয়েক দশ হাজার মানুষ। বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিচের কেন্দ্র-বাম সরকার দেশটির নুবলে, বিও-বিও এবং লা আরাউকানিয়া অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে “স্টেট অব ক্যাটাস্ট্রোফি” ঘোষণা করেছে।

চিলির ন্যাশনাল ফরেস্ট্রি কর্পোরেশন (CONAF)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে দেশজুড়ে অন্তত ৪৮টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি আগুনের কেন্দ্রস্থলে দমকল বাহিনী ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা সর্বশক্তি দিয়ে কাজ চালাচ্ছে। ১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৮০টির বেশি দাবানল নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৩৯টি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

সরকারি হিসাব বলছে, আগুনে পুড়ে গেছে ৬৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। চিলির জনপথ ও পরিকাঠামো মন্ত্রক  জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই ২ হাজার টনের বেশি ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিও-বিও অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চিলির লিগ্যাল মেডিক্যাল সার্ভিস (SML) জানিয়েছে, ২৪ জানুয়ারি চারজন নিহতের মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিও-বিও অঞ্চলের প্রধান কৌঁসুলি মার্সেলা কার্তাহেনা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আজকের অভিযানে উদ্ধার হওয়া এক ব্যক্তি ছাড়া, এই অঞ্চলে নিহতদের পরিচয় আমরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে শনাক্ত করতে পেরেছি।”

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিচ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিও-বিও অঞ্চল থেকেই আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে খাদ্য, নগদ সহায়তা এবং জরুরি বাসস্থানের ব্যবস্থা করছি। তালকাহুয়ানো সংগ্রহকেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। সংগঠিতভাবে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠব।”

আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মেক্সিকো থেকে ১৯৫ জন, উরুগুয়ে থেকে ৩১ জন, আর্জেন্টিনা থেকে ১৫ জন, স্পেন থেকে ১০ জনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দমকল কর্মীরা চিলির বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন। কর্তৃপক্ষের ধারণা, অন্তত আরও দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে এই অভিযান চলতে পারে।

বর্তমানে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় আগুনের বিস্তার সাময়িকভাবে ধীর হয়েছে। তবে CONAF-এর পরিচালক রদ্রিগো ইলেসকা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ২৭ জানুয়ারির পর থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তনে মাউলে অঞ্চল এবং লা আরাউকানিয়ার পার্বত্য এলাকাগুলোতে আগুন আবারও ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের দাবানল শুধু গ্রীষ্মের তীব্র তাপমাত্রা, খরা কিংবা বাতাসের ফল নয়। মানুষের দীর্ঘদিনের পরিবেশ ধ্বংস, একফসলি বনজ চাষ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। চিলি বহু বছর ধরে দীর্ঘস্থায়ী খরার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বনভূমিকে একপ্রকার বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে।

চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট ফায়ার ল্যাবরেটরির পরিচালক মিগেল কাস্তিয়ো বলেন, “এবার আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যা স্বাভাবিক দাবানল মৌসুমের গড় হিসাবের অনেক ঊর্ধ্বে। আগুনের সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট ছবিতেই এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা শুধু চিলির জন্য নয়, গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ভবিষ্যতে এমন দাবানল আরও ঘন ঘন এবং আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে এমনটাই আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।