আজকাল ওয়েবডেস্ক: কনকনে শীতের মধ্যেই লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডে রবিবার বিকেলে দেখা গেল এক অদ্ভুত কিন্তু পরিচিত দৃশ্য। শত শত মানুষ প্যান্ট বা ট্রাউজার ছাড়াই, শুধুই অন্তর্বাস পরে চড়ে বসলেন টিউব ট্রেনে। বার্ষিক ‘নো ট্রাউজার্স টিউব রাইড’ আবার ফিরে এল, আর তাতে অংশ নিতে ঠান্ডা বা অস্বস্তি কোনও কিছুই যেন বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল না।
চায়নাটাউনের নিউপোর্ট প্লেসে প্রথমে জমায়েত হন খালি পা-ওয়ালা পুরুষ ও মহিলা অংশগ্রহণকারীরা। তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের কাছাকাছি, তবু রঙিন অন্তর্বাস পরে, কেউ হাসিমুখে, কেউ আবার নির্বিকার ভঙ্গিতে ঢুকে পড়েন ট্রেনের কামরায়। একই ধরনের ভিড় দেখা যায় ওয়াটারলু, ওয়েস্টমিনস্টার এবং সাউথ কেনসিংটন স্টেশনেও। বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, লন্ডনের বিভিন্ন প্রান্তে এই দৃশ্য দেখে অনেক নিত্যযাত্রী যেমন অবাক হয়েছেন, তেমনই অনেকেই মুচকি হেসেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা এসকেলেটর বেয়ে নামছেন, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছেন বা ট্রেনের ভেতর স্বচ্ছন্দে পোজ দিচ্ছেন। কারও অন্তর্বাস একেবারে সাধারণ, কারওটা রঙিন বা নজরকাড়া কিন্তু সবার মধ্যেই ছিল এক ধরনের নির্ভরতা, যেন এটাই দিনের সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ।
এই আয়োজনের উদ্যোক্তারা আগেই ফেসবুকে অংশগ্রহণকারীদের একটি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন অন্তর্বাস যেন “যতটা সম্ভব সাধারণ বা লো-প্রোফাইল” হয়, যাতে দেখে মনে হয় ট্রাউজার পরতে ভুলে গেছেন। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ‘ভুলে যাওয়ার’ ভানটাই পুরো ঘটনার মূল মজা।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
এই উদ্যোগের পেছনে কোনও রাজনৈতিক বার্তা বা প্রতিবাদ নেই এ কথা বারবারই জানিয়েছেন আয়োজকেরা। মূল উদ্দেশ্য একটাই: শীতের মাঝখানে সামান্য হালকাভাব, একটু হাসি। এই আয়োজনের অন্যতম মুখ ডেভ সেলকার্ক, যিনি পেশায় একজন পার্সোনাল ট্রেনার, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “চারপাশে এত খারাপ খবর, এত গম্ভীরতা কখনও কখনও শুধু মজা করার জন্য কিছু করা দরকার। কোনও কারণ ছাড়াই।”
এই অভিনব ধারণার জন্ম হয়েছিল বহু দূরে, নিউ ইয়র্কে। ২০০২ সালে স্থানীয় কৌতুকাভিনেতা চার্লি টড প্রথম এমন একটি আয়োজন করেন। তাঁর মাথায় এসেছিল, শীতের মধ্যে কেউ যদি টুপি, গ্লাভস, স্কার্ফ পরে সাবওয়েতে ওঠে, কিন্তু প্যান্ট না পরে তাহলে সেটা দেখেই মানুষ একটু থমকে যাবে, একটু হাসবে। সেই ভাবনাই পরে এক আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
চার্লি টড নিজে বিবিসিকে বলেছেন, এই আয়োজনের একমাত্র উদ্দেশ্য “অপ্রত্যাশিত আনন্দ, বিস্ময় আর হালকা বিভ্রান্তি তৈরি করা”। তাঁর কথায়, “এটা একেবারেই নিরীহ মজা। এমন একটা সময়ে আমরা বাস করছি, যখন সংস্কৃতি যুদ্ধ আর তর্ক-বিতর্কে মানুষ ক্লান্ত। আমার লক্ষ্য সবসময়ই ছিল মানুষকে হাসানো।”
প্রথম বছরে নিউ ইয়র্কে অংশ নিয়েছিলেন মাত্র সাতজন। তাঁরা একে একে সাতটি স্টেশনে ট্রেনে উঠেছিলেন এবং এমন ভান করেছিলেন, যেন একে অপরকে চেনেনই না। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ছোট্ট মজা এক আন্তর্জাতিক উৎসবের রূপ নেয়। ২০০৮ সালে নিউ ইয়র্কেই অংশ নেন প্রায় ৯০০ জন, আর সঙ্গে যোগ দেয় আরও নয়টি শহর।
এরপর থেকে শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, বোস্টন, টরন্টো, ওয়াশিংটন ডিসি, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড, বিশ্বের নানা বড় শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই ‘নো ট্রাউজার্স’ রাইড। লন্ডনের এবারের আয়োজনও দেখিয়ে দিল, ঠান্ডা, ক্লান্তি আর কঠিন সময়ের মধ্যেও মানুষ এখনও হাসির অজুহাত খুঁজে নিতে চায়, হোক তা শুধু একদিনের জন্য, ট্রাউজার ছাড়াই।
