আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠন B'Tselem একটি বিস্তৃত ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করে—শিরোনাম: “Living Hell: The Israeli Prison System as a Network of Torture Camps”। এই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের কারাগার ও আটক শিবিরে বন্দি প্যালেস্তিনীয়দের ওপর চলমান নির্যাতনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয় বরং একটি কাঠামোগত হিংসার ইঙ্গিত বহন করে, যা বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
এই নতুন প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের আগের রিপোর্ট “Welcome to Hell”-এর সম্প্রসারিত সংস্করণ। এতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় বা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুক্তি পাওয়া ২১ জন প্যালেস্তিনীয়দের সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান, চিকিৎসাবঞ্চনা এবং অমানবিক কারাবাসের অভিজ্ঞতা। প্রতিবেদনের দাবি—এগুলি কোনও ‘ব্যতিক্রমী’ ঘটনা নয়, বরং নীতিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এক দমনযন্ত্রের অংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ৮৪ জন প্যালেস্তিনীয় বন্দি ইসরায়েলি হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন, যার মধ্যে একজন নাবালকও রয়েছে। নিহতদের অধিকাংশের মৃতদেহ এখনও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
বন্দিদের বিবরণ অনুযায়ী, কারাগারে অতিরিক্ত ভিড়, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব, চিকিৎসা পরিষেবার ঘাটতি, দীর্ঘ সময় একাকী বন্দিত্ব, শারীরিক নির্যাতন, এমনকি যৌন হিংসার অভিযোগও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া বা শক্ত বস্তু ব্যবহার করে যৌন নিপীড়নের অভিযোগও উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইনে যেসব কাজ স্পষ্টতই নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত, সেই মানদণ্ডেই এসব ঘটনাকে দেখা উচিত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী Itamar Ben-Gvir-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারা ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা এই মন্ত্রী অতীতে প্রকাশ্যে কঠোর আচরণের পক্ষে মন্তব্য করেছেন। যদিও ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা ও পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গাজা স্ট্রিপ ও পশ্চিম তীর জুড়ে গণগ্রেপ্তার, বাড়িঘর ধ্বংস এবং প্রশাসনিক আটক—এই সমস্ত পদক্ষেপকে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনিক আটক ব্যবস্থায় কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি রাখা হয়—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খায় না।
প্যালেস্তিনীয়দের মানবাধিকার সংগঠন Addameer অতীতে আল-মাসকোবিয়েহ জেরা কেন্দ্রে নির্যাতনের বিশদ নথি প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বহু দশক ধরেই প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপর নির্যাতন চলছে। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলি কারাগারে অন্তত ২৩৭ জন প্যালেস্তিনীয় মৃত্যুবরণ করেছেন। রেড ক্রসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর থেকে ১২ লক্ষেরও বেশি প্যালেস্তিনীয় গ্রেপ্তার হয়েছেন—যা পশ্চিম তীর ও গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হল Marwan Barghouti। ২০০২ সাল থেকে কারাবন্দি এই ফাতাহ নেতা বহু প্যালেস্তিনীয়দের কাছে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও ঐক্যের প্রতীক। তাঁর বিরুদ্ধে হিংসার অভিযোগ থাকলেও সমর্থকদের মতে বিচার প্রক্রিয়া ছিল বিতর্কিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁকে দীর্ঘ একাকী বন্দিত্ব, শারীরিক নির্যাতন ও চিকিৎসা বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, কারাবাস ও টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড একই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ—যেখানে নেতৃত্বকে নিষ্ক্রিয় বা নির্মূল করার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিরোধ দুর্বল করা হয়। গ্রেপ্তার ও হত্যা—উভয়ই রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে। প্যালেস্তিনীয় বন্দিরা কারাগারের ভিতরেই শিক্ষা ও সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন। Al-Quds University ২০০৫ সাল থেকে বন্দিদের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কর্মসূচি চালু করে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বন্দি এই কর্মসূচি থেকে স্নাতক হয়েছেন।
এই সমগ্র পরিস্থিতি কেবল একটি দেশের কারা-ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আইনের শাসন ও নৈতিকতার প্রশ্ন। বন্দিদের মানবিক আচরণ, স্বচ্ছতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
