আজকাল ওয়েবডেস্ক: গাজা সংঘাতে বৃহস্পতিবার এক নতুন ও জটিল অধ্যায়ের সূচনা হলো। আমেরিকা যখন হামাসের সঙ্গে ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হওয়ার কথা ঘোষণা করছে, ঠিক সেই সময়েই ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন প্যালেস্তিনীয়ের মৃত্যু হয়েছে। কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই খবর জানিয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১৬ বছরের এক কিশোর। মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহ এলাকায় আল-হাওলি ও আল-জারু পরিবারভুক্ত দুটি বাড়িতে চালানো বোমা হামলায় সে প্রাণ হারায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নিহতদের একজন, মুহাম্মদ আল-হাওলি, হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসসাম ব্রিগেডসের একজন কমান্ডার ছিলেন। এই দাবি যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলা ইসরায়েলের কড়া অবস্থানেরই প্রতিফলন, বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের শর্ত নির্ধারণ নিয়ে। এই ধাপে গাজায় একটি প্যালেস্তিনীয় প্রশাসন গঠনের কথা রয়েছে, যা একটি আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। কিন্তু এই রাজনৈতিক কাঠামোর আড়ালেই নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
গাজার অন্য এলাকাগুলিতেও হিংসা অব্যাহত রয়েছে। রাফাহ শহরের পশ্চিমে আল-আলাম গোলচত্বরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে একজন নিহত হন। আল-নাবলুসি জংশনের কাছে একটি পুলিশ পোস্ট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। একইসঙ্গে নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে আল-খাতিব পরিবারের বাড়িতে হামলায় আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
হামাস এক বিবৃতিতে আল-হাওলির বাড়িতে হামলাকে “জঘন্য অপরাধ” বলে আখ্যা দিয়েছে এবং অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। যদিও হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও আল-হাওলির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫১ জন প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০০-রও বেশি শিশু। ইসরায়েল গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে এবং সেনারা একটি চলমান ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে অবস্থান নিয়েছে। একই সময়ে তিনজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিকে আরও স্থায়ী কাঠামোয় রূপ দিতে উদ্যোগী হয়েছে। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। এই ধাপে কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, বরং গাজার নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক শাসনব্যবস্থা ও পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান শর্ত হল হামাসসহ সব ‘অননুমোদিত সশস্ত্র গোষ্ঠী’র পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ।
গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবও রয়েছে। তারা নির্বাচিত প্যালেস্তিনীয় পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে। পাশাপাশি ১৫ সদস্যের একটি টেকনোক্র্যাটিক কমিটি ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করবে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন প্যালেস্তিনীয় কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন উপমন্ত্রী আলি শাথ। বর্তমানে তিনি মিশরে অবস্থান করছেন এবং গাজায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আলি শাথ জানিয়েছেন, এই প্রশাসন “অস্ত্র নয়, মেধার ওপর নির্ভর করবে” এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে কোনও সমন্বয়ে যাবে না। হামাসের শীর্ষ নেতা বাসেম নাইম এই উদ্যোগকে “সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ” বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “এটি যুদ্ধবিরতি সুসংহত করতে, নতুন করে যুদ্ধ এড়াতে, মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে এবং সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের পথ খুলে দিতে অত্যন্ত জরুরি।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যস্থতাকারীদের এই কমিটিকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর নেতৃত্বে থাকবেন বলে জানা গেছে বুলগেরিয়ান কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ। ট্রাম্প নিজে বাছাই করা সদস্যদের আমন্ত্রণ ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়েছে বলে খবর।
উল্লেখ্য, পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ১০ অক্টোবর শুরু হয়েছিল। এতে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি বন্দিদের বিনিময়ে প্যালেস্তিনীয় বন্দিমুক্তি এবং মানবিক ত্রাণ বৃদ্ধির কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল এখনও ত্রাণ সরবরাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে গাজার ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ শীতের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের ঘর আর অস্থায়ী আশ্রয়ে পশুর মতো জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনওপিএস-এর প্রধান হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা পরিস্থিতিকে “অমানবিক” বলে বর্ণনা করেছেন। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিশনের যৌথ হিসেব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার। আলি শাথ জানিয়েছেন, গাজায় রয়েছে প্রায় ৬ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ, অসংখ্য না বিস্ফোরন হওয়া গোলাবারুদ, বিপজ্জনক বর্জ্য এবং ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের অংশ। তাঁর কল্পনায়, বুলডোজার দিয়ে এই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন ভূমি ও নতুন আশার জন্ম দেওয়া হবে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করলেও গাজা আজও ক্ষতবিক্ষত এক ভূখণ্ড, যেখানে যুদ্ধের দাগ স্পষ্ট, অথচ শাসনব্যবস্থা, পুনর্গঠন ও সতর্ক আশার সম্ভাবনা এক সুতোয় ঝুলে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দীর সংঘাতের মধ্যেও গাজার মানুষ যে এখনও টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছে, এই অধ্যায় তারই আরেকটি কঠিন সাক্ষ্য।
