আজকাল ওয়েবডেস্ক:  মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে জমে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শনিবার ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো করেছে। ইজরায়েল জানিয়েছে, তারা “প্রি-এম্পটিভ” বা আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে “বড় ধরনের সামরিক অভিযান” শুরুর কথা নিশ্চিত করে বলেন, ইরানকে কখনই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।


ট্রাম্প বলেন, “আমাদের লক্ষ্য আমেরিকান জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ইরানি শাসনের হুমকি ধ্বংস করা। ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের চেষ্টা করেছে।” মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাতারের এক সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই যৌথ বিমান হামলার উদ্দেশ্য ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং সামরিক ক্ষমতা দুর্বল করা।


তিনি আরও বলেন, ১৯৮৩ সালে ইরানের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো বেইরুটে মেরিন কর্পস ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যাতে ২৪১ জন আমেরিকান সেনাসদস্য নিহত হন। ২০০০ সালে ইউএসএস কোলের ওপর হামলার বিষয়ে তারা জানত এবং সম্ভবত এতে জড়িত ছিল। এতে বহু মানুষ নিহত হয়। ইরানি বাহিনী ইরাকে শত শত আমেরিকান সেনাসদস্যকে হত্যা ও আহত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাসনব্যবস্থার মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকান বাহিনী, মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অসংখ্য হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এটি ছিল ব্যাপক সন্ত্রাসবাদ, এবং আমরা আর এটি সহ্য করব না। লেবানন থেকে ইয়েমেন, সিরিয়া থেকে ইরাক—এই শাসনব্যবস্থা সন্ত্রাসী মিলিশিয়াদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে অঞ্চলটিকে রক্তাক্ত করেছে।


ইরানকে জোরালো ভাষায় কটাক্ষ করে ট্রাম্প বলেন, ইরান হল বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী শক্তি, এবং সম্প্রতি তারা রাস্তায় প্রতিবাদ করা হাজার হাজার নিজ নাগরিককেও হত্যা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি। ভাবুন তো, যদি এই শাসনব্যবস্থা সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পায়, তাহলে তারা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী অভিযান শুরু করেছে। আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করব। তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা হবে। আমরা নিশ্চিত করব যে তাদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আর অঞ্চল বা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করতে না পারে এবং আমাদের বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে না পারে।


ট্রাম্প বলেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, সশস্ত্র বাহিনী ও সকল পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি—অস্ত্র সমর্পণ করুন, তাহলে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও ন্যায্য আচরণ পাবেন; অন্যথায় কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হবেন। এবং ইরানের জনগণের প্রতি আমার আহ্বান—আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে। নিরাপদ থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না—পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। যখন সব শেষ হবে, তখন আপনারাই নিজেদের সরকারের দায়িত্ব নিন। বহু বছর ধরে আপনারা আমেরিকার সহায়তা চেয়েছেন—আজ সেই সুযোগ এসেছে। এখনই সময় নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার। এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।


এদিকে তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের হামলার জবাব হবে। প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। অন্তত ৩০টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে।


হামলার পর রাজধানী তেহরানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। শহরের বহু পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, মানুষ তড়িঘড়ি করে জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। অনেক পরিবার রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যা সম্ভাব্য আরও সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা প্রতিফলিত করছে।


পরিস্থিতির অবনতি বিবেচনায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অতি প্রয়োজন ছাড়া ইরানে ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে এবং বর্তমানে সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিকদের সতর্ক থাকতে, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।

 


বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় নতুন সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে সংযম ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।