আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্য এশিয়াতে ফের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ইরান ঘোষণা করেছে, হরমুজ প্রণালী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, কারণ দেশের বিপুল পরিমাণ এলপিজি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই সামুদ্রিক পথ দিয়েই আসে।
বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেলের উৎস বৈচিত্র্যময় হওয়ায় কিছুটা সুরক্ষা থাকলেও রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়, যার অধিকাংশই ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালী হয়ে দেশে পৌঁছায়। ফলে দীর্ঘ সময় এই জলপথ বন্ধ থাকলে এলপিজি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপিছু প্রায় ৭৯ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভারতের পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের দামের উপর।
মধ্য এশিয়াতে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরিন-সহ উপসাগরীয় দেশগুলিতে এক কোটিরও বেশি ভারতীয় বাস করেন। সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর একাধিক দেশ তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে এবং জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। ইতিমধ্যেই সংঘাত-সংক্রান্ত পৃথক ঘটনায় কয়েকজন ভারতীয়ের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে।
ভারত সরকার পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলির নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর আগে উত্তেজনা বাড়ার সময় ভারতীয় নৌবাহিনী অপারেশন সংকল্প চালু করে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং এলপিজি বহনকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডজানিয়েছে, গত কয়েক দিনে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন ঘাঁটি, নৌবাহিনীর ঘাঁটি, গোলাবারুদ ভাণ্ডার এবং যোগাযোগ কাঠামো-সহ ৩০০-রও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। এর আগে একটি সাইপ্রাস-নিবন্ধিত মালবাহী জাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস নৌবাহিনী ঘোষণা করেছে, 'পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত' হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। ইরানের সংসদের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কবে খুলবে, তা শুধুমাত্র ইরানই নির্ধারণ করবে।
পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে পড়তে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরিন, কুয়েত ও কাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং ভারত-সহ বহু আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।















