আজকাল ওয়েবডেস্ক: চিনের বিজ্ঞানীরা এমন এক নতুন প্রজন্মের নিউক্লিয়ার ব্যাটারি তৈরি করেছেন, যা তাত্ত্বিকভাবে হাজার হাজার বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। উত্তর-পশ্চিম নরমাল ইউনিভার্সিটি এবং গ্যানসু ঝুলং টেকনোলজির গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ব্যাটারির নাম ‘কিয়ানজিয়ুয়ান তিয়ানশু’ । এটি কার্বন-১৪ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ এবং সিলিকন কার্বাইড সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।


নিউক্লিয়ার ব্যাটারি, যাকে রেডিওআইসোটোপ ব্যাটারি বা অ্যাটমিক ব্যাটারিও বলা হয়, সাধারণ রাসায়নিক ব্যাটারির মত কাজ করে না। এতে থাকা তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার সময় যে শক্তি উৎপন্ন হয়, সেটিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। যেহেতু কার্বন-১৪-এর অর্ধ-জীবন প্রায় ৫,৭৩০ বছর, তাই এই ধরনের ব্যাটারি অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে।


চীনের গবেষকরা জানিয়েছেন, এটি তাদের ২০২৪ সালে তৈরি ‘ক্যান্ডল ড্রাগন-১’ নিউক্লিয়ার ব্যাটারির তুলনায় অনেক উন্নত। নতুন ব্যাটারিতে তেজস্ক্রিয় উপাদানের ব্যবহার প্রায় ২২ শতাংশ কমানো হয়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২.৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারির ভোল্টেজ ও স্থিতিশীলতা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।


গবেষণা দলের প্রধান সু মাওগেন জানান, আগের মডেলগুলিতে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন, বেশি খরচ এবং জটিল নকশার সমস্যা ছিল। তাই নতুন ব্যাটারিকে আরও ছোট, শক্তিশালী, সাশ্রয়ী এবং সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন মডেলে ত্রিমাত্রিক স্ট্যাকড ডিজাইন, উন্নত রেডিওঅ্যাকটিভ সোর্স, মাইক্রো-পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং স্বয়ংক্রিয় সেন্সর সংযোজন করা হয়েছে, যা বাহ্যিক বিদ্যুৎ ছাড়াই দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ব্যাটারিতে সিলিকন কার্বাইড ট্রান্সডিউসার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রচলিত নিউক্লিয়ার ব্যাটারিতে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়, যার জন্য বড় আকারের এবং উচ্চ তাপমাত্রায় চলা যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন প্রযুক্তিতে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সময় নির্গত বিটা কণা সরাসরি সেমিকন্ডাক্টরের উপর আঘাত করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। ফলে এটি অনেক বেশি কার্যকর, ছোট এবং শক্তি সাশ্রয়ী।


মাত্র ১৬.৮ ঘন সেন্টিমিটার আয়তনের এই ব্যাটারিতে ১২৯ মিলিকিউরি কার্বন-১৪ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ২.০৬ ভোল্ট ভোল্টেজ, ০.৭১৩ মাইক্রোঅ্যাম্পিয়ার কারেন্ট এবং সর্বোচ্চ ১.১৩ মাইক্রোওয়াট শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম। যদিও এর ক্ষমতা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি ও কম শক্তির প্রয়োজন এমন যন্ত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মহাকাশ গবেষণা, চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযান, গভীর সমুদ্রের সেন্সর, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, সামরিক সরঞ্জাম এবং পেসমেকারের মতো চিকিৎসা যন্ত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইতিমধ্যেই নাসা ভয়েজার মহাকাশযান এবং কিউরিওসিটি রোভারে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি ব্যবহার করেছে। চীনও চ্যাং’ই-৩ ও চ্যাং’ই-৪ চন্দ্র রোভারে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করেছে।


গবেষকদের দাবি, ছোট আকার, দীর্ঘ আয়ু এবং উন্নত শক্তি ঘনত্বের কারণে এটি ভবিষ্যতের শিল্প ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। যদি এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার সফল হয়, তবে এমন সব যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে যেগুলিকে জীবদ্দশায় আর কখনও চার্জ দেওয়ার প্রয়োজনই হবে না।

&t=1s