আজকাল ওয়েবডেস্ক: কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সোনা চুরির ঘটনার তদন্তে বড় সাফল্য পেল পুলিশ। ২০২৩ সালে টরন্টো বিমানবন্দরে এয়ার কানাডার কার্গো টার্মিনাল থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মূল্যের সোনার বার চুরি মামলায় দুবাই থেকে টরন্টো ফেরার সময় গ্রেপ্তার হলেন ৪৩ বছর বয়সি আরসালান চৌধুরী। সোমবার সকাল প্রায় ৯টার কিছু আগে পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আটক করে পিল রিজিওনাল পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, আরসালান চৌধুরীর কোনও স্থায়ী ঠিকানা নেই। তিনি নিজেই তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে গত ডিসেম্বর মাসে পুলিশকে জানান যে তিনি কানাডায় ফিরতে চান। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ আগাম প্রস্তুতি নেয়। পিল রিজিওনাল পুলিশের ইন্সপেক্টর মাইক ম্যাভিটি জানান,
“তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাই বিমান নামার পরই আমরা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি।”
এই গ্রেপ্তারি ‘প্রজেক্ট ২৪কে’ নামের দীর্ঘদিনের তদন্তের অংশ, যা কানাডার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই সোনা চুরির রহস্য উদ্ঘাটনে চালানো হচ্ছে।
কী অভিযোগ আনা হয়েছে?
আরসালান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৫,০০০ কানাডিয়ান ডলারের বেশি মূল্যের চুরি, চুরির মাল কবজা করে রাখা এবং গুরুতর অপরাধের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। আপাতত তাঁকে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং জামিন শুনানির অপেক্ষা চলছে।
কীভাবে হয়েছিল এই দুঃসাহসিক চুরি?
ঘটনাটি ঘটে ১৭ এপ্রিল, ২০২৩। সেদিন সুইৎজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে এয়ার কানাডার একটি বিমানে করে সোনা এসে পৌঁছয় টরন্টো বিমানবন্দরে। বিমানের কার্গো হোল্ডে থাকা চালানে ছিল প্রায় ৪০০ কেজি .৯৯৯৯ খাঁটি সোনা, অর্থাৎ প্রায় ৬,৬০০টি সোনার বার, সঙ্গে ছিল প্রায় ২৫ লক্ষ কানাডিয়ান ডলার বিদেশি মুদ্রা।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
পুলিশের দাবি, এক অভিযুক্ত পাঁচ টনের একটি ডেলিভারি ট্রাক নিয়ে কার্গো ওয়্যারহাউসে হাজির হয় এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পুরো চালানটি নিয়ে চম্পট দেয়। শুধু সোনার দামই তখন আনুমানিক ২০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি ছিল।
এখনও অধরা বিপুল পরিমাণ সোনা
এতদিনে তদন্তে বড় অগ্রগতি হলেও উদ্ধার হয়েছে খুব অল্প পরিমাণ সোনা। ইন্সপেক্টর ম্যাভিটি জানান, “আমরা মাত্র প্রায় এক কেজির মতো সোনা এবং কিছু নগদ অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছি, যা আমরা মনে করি এই চুরির লাভের অংশ। বিশাল অংশের সোনা এখনও নিখোঁজ।”
পুলিশের আশঙ্কা, চুরি হওয়া সোনার বড় অংশই গলিয়ে ফেলা হয়েছে। পরে তা গয়না বা নতুন বার বানিয়ে দুবাই ও ভারতসহ বিভিন্ন বিদেশি বাজারে বিক্রি করা হয়েছে, যেখানে খাঁটি সোনা বিক্রি করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছেন, এই সোনা চুরির টাকা ব্যবহার করে একটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র পাচার চক্রেও অর্থ জোগানো হয়েছিল। বিষয়টি মামলাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
ভারতে লুকিয়ে মূল অভিযুক্ত?
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছে। তবে কয়েকজন এখনও পলাতক। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সিমরন প্রীত পনসার, ৩৩ বছর বয়সি এক প্রাক্তন এয়ার কানাডা কর্মী, ব্র্যাম্পটনের বাসিন্দা। পুলিশের দাবি, পনসারই এয়ারলাইনের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ব্যবহার করে কার্গো শনাক্ত ও অন্যদিকে চালান করতে সাহায্য করেছিলেন।
কানাডা জুড়ে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে এবং পুলিশ মনে করছে তিনি বর্তমানে ভারতে আছেন। তদন্তে জানা গেছে, গত বছর তাঁকে চণ্ডীগড়ে ভাড়া নেওয়া একটি ফ্ল্যাটে থাকার সূত্রও পাওয়া গিয়েছিল। পনসারেকে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানো হয়েছে, যদিও এখনও সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি।
পুলিশ খুঁজছে আরও এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিযুক্ত প্রসাথ পরমালিঙ্গাম (৩৬), ব্র্যাম্পটনের বাসিন্দা, যিনি ২০২৪ সালের আগস্টে আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বেঞ্চ ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে।
এছাড়া দুরান্তে কিং-ম্যাকলিন (২৭), ব্র্যাম্পটনের বাসিন্দা, তাঁর বিরুদ্ধেও আলাদা পরোয়ানা রয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন এবং চলতি বছর সেখানেই তাঁর সাজা ঘোষণা হওয়ার কথা।
এর আগে, ২০২৪ সালের মে মাসে ভারত থেকে টরন্টো আসার সময় বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আরেক অভিযুক্ত আর্চিত গ্রোভারকে। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যান্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন এয়ার কানাডা কর্মী পারমপাল সিধু (৫৪) এবং অন্টারিওর বাসিন্দা অমিত জালোটা (৪০)।
পুলিশ স্পষ্ট করেছে, এটি এখনও চলছে তদন্ত। চুরি হওয়া সোনার বড় অংশ উদ্ধার করা, পলাতক অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলাই এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য।
