আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর উত্থান। শ্রমজীবী পরিবারেরর ছেলের ক্রমশ বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া, তারপর বাস চালক থেকে দেশের শীর্ষ পদে আরোহন, মাদুরোর দীর্ঘ পথচলা যেমন নাটকীয়, তেমনই বিতর্কের।
তবে শনিবার বামপন্থী মাদুরোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংঘাত নাটকীয় মোড় নিল। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী বন্দি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার চক্র পরিচালনা এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদারকি করার অভিযোগে সরব। মাদুরোকে পদত্যাগের জন্য কয়েক মাস ধরে নাগাড়ে চাপ দেওয়ার পরেই শনিবার পদক্ষেপ করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
শ্রমজীবী পরিবার থেকে শাভেজের বিশ্বস্ত অনুসারী
মাদুরো ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর একটি শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতার ছেলে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি একজন বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন, ঠিক সেই সময়েই ১৯৯২ সালে সেনাকর্তা হুগো শাভেজ একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। মাদুরো পরে শাভেজকে কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্য প্রচার চালান এবং তাঁর বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচির একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার কাঠামোয় উত্থান
১৯৯৮ সালে শাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মাদুরো আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং আইনসভায় একটি আসন লাভ করেন। তিনি পরে জাতীয় পরিষদের সভাপতি হন এবং পরবর্তীতে বিদেশমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক জোট গঠনের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে বিভিন্ন দেশ সফর করেন। মৃত্যুর আগে শাভেজ প্রকাশ্যে মাদুরোকে তাঁর মনোনীত উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন।
অর্থনৈতিক পতন ও দমন-পীড়নের জন্য পরিচিত মাদুরোর শাসনকাল
শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে মাদুরো অল্প ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর শাসনকালে ভেনিজুয়েলা গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। অতি মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এবং ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের ব্যাপক দেশত্যাগে জন্য দায়ী করা হয় প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তগুলোকে। তাঁর শাসনের সময় নির্বাচনে কারচুপি, বিক্ষোভকারীদের উপর কঠোর দমন-পীড়নের অভিযো উঠেছে, বিশেষ করে ২০১৪ এবং ২০১৭ সালে।
নিষেধাজ্ঞা, বিতর্কিত জনাদেশ এবং বিশ্ব নজরদারি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশগুলো মাদুরোর সরকারের উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ২০২০ সালে ওয়াশিংটন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে তিনি ধারাবাহিকভাবে সেইসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নিকোলাস মাদুরো তৃতীয় মেয়াদের জন্য শপথ নেন। যদিও সেই নির্বাচনকে বিরোধী দল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা 'জালিয়াতি' বলে নিন্দা করেছিল। এর ফলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রসংঘের একটি সাম্প্রতিক তথ্য অনুসন্ধান মিশন, ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের বিরুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ সামনে এনেছে।
বিরোধী নেত্রীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর আলোকপাত করেছে
বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করার পর ভেনিজুয়েলা সরকারের দমনমূলক কর্মকাণ্ড নতুন করে আন্তর্জাতিক নজরকাড়ে। এই পদক্ষেপটিকে মাচাদোর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতি বিশ্বের সমর্থন এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের ওপর মাদুরোর দমন-পীড়নের প্রতি তীব্র নিন্দা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
