আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্স (X)–এর বিরুদ্ধে গুরুতর তদন্ত শুরু করেছে ইউরোপীয় কমিশন। অভিযোগ, এক্স-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুল গ্রোক (Grok) ব্যবহার করে বাস্তব মানুষের যৌনভাবে বিকৃত ও যৌনগন্ধী ছবি তৈরি করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের আশঙ্কা, এই ধরনের কনটেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল আইন লঙ্ঘন করতে পারে।
এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন জানুয়ারিতে ব্রিটেনের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা Ofcom একই ধরনের অভিযোগে এক্স-এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর ঘোষণা করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA) অনুযায়ী, যদি প্রমাণ হয় যে এক্স তার আইনি দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে সংস্থাটির ওপর বিশ্বব্যাপী বার্ষিক টার্নওভারের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। প্রয়োজনে কমিশন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতেও পারে যদি এক্স দ্রুত ও কার্যকর পরিবর্তন আনতে অস্বীকার করে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইরিশ সদস্য রেজিনা ডোহার্টি জানান, কমিশন খতিয়ে দেখবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবহারকারীদের সামনে কি না “যৌনভাবে বিকৃত ও কারসাজি করা ছবি” দেখানো হয়েছে। তাঁর কথায়, এক্সের মতো বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি আদৌ কি অনলাইন ঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করছে এবং অবৈধ ও ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানো ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রযুক্তি সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র বিষয়ক এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট হেনা ভির্কুনেন যৌন ডিপফেককে “সহিংস ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য অবমাননার একটি রূপ” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বোঝা যাবে এক্স কি DSA অনুযায়ী তার আইনি বাধ্যবাধকতা মেনেছে, নাকি ইউরোপীয় নাগরিকদের, বিশেষত মহিলা ও শিশুদের অধিকার, তাদের পরিষেবার ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়েছে।
এর আগে এক্স-এর সেফটি অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছিল, যেসব দেশে এই ধরনের কনটেন্ট অবৈধ, সেখানে 'গ্রোক' মানুষের ছবি থেকে ডিজিটালি পোশাক সরানোর ক্ষমতা বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু অধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগীদের মতে, এই ধরনের ছবি তৈরি করার সুযোগই কখনও থাকা উচিত ছিল না। ব্রিটেনের নারী অধিকার সংগঠন এন্ড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন কোয়ালিশন–এর পরিচালক আন্দ্রেয়া সাইমন বলেন, শুধু কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তি সংস্থাগুলি যেন অনলাইন নির্যাতন থেকে মুনাফা করতে না পারে, সে জন্য সরকারগুলির আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এই তদন্তের পাশাপাশি, ইউরোপীয় কমিশন ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে চলা আরেকটি তদন্তের পরিধিও বাড়িয়েছে, যেখানে এক্স-এর কনটেন্ট রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের সামনে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত ঘোষণার আগেই ইলন মাস্ক এক্স-এ একটি পোস্ট করে গ্রোক সংক্রান্ত নতুন বিধিনিষেধ নিয়ে হালকা রসিকতা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। মাস্ক আগেও যুক্তরাজ্য সরকারসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমালোচনা করে বলেছেন, এই সব উদ্যোগ আসলে “সেন্সরশিপের অজুহাত”। রোববার গ্রোক-এর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট দাবি করেছে, মাত্র ৩০ দিনে এই টুল দিয়ে ৫.৫ বিলিয়নেরও বেশি ছবি তৈরি হয়েছে।
এক্স-এর এই এআই টুল নিয়ে তদন্ত চলছে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানিতেও। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সাময়িকভাবে গ্রক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যদিও পরে মালয়েশিয়া সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এক মাস আগেই ইউরোপীয় কমিশন এক্স-কে ১২০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছিল তাদের ব্লু টিক যাচাই ব্যবস্থা নিয়ে। কমিশনের অভিযোগ ছিল, এক্স প্রকৃত পরিচয় যাচাই না করেই ব্লু টিক দিচ্ছে, যা ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করছে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারাল কমিউনিকেশনস কমিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে “আক্রমণ ও সেন্সর করার” অভিযোগ তোলে। মাস্ক সেই মন্তব্য শেয়ার করে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় লেখেন “Absolutely।”
এই মুহূর্তে ইউরোপীয় কমিশনের তদন্ত শুধু এক্স বা গ্রোককে ঘিরে নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তি সংস্থার দায়বদ্ধতা, নাগরিক অধিকার ও অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নীতিগত সংঘাতের দিকেই নজর টানছে।
