আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরাগমন আগের তুলনায় আরও বিতর্কিত। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর পেরিয়ে গেল এবং এই এক বছরে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাঁর নেতৃত্বকে অনেকে “স্পেকট্যাকল প্রেসিডেন্সি” বলে থাকেন। রাজনীতি, নীতি, বাজার, কূটনীতি—সবকিছুকেই তিনি এক ধরনের মিডিয়া-শোতে রূপান্তরিত করেছেন, যেখানে নাটক, সংঘাত, ট্রলিং এবং ট্যারিফ তাঁর প্রধান অস্ত্র।


ট্যারিফের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রদর্শন
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক থিয়েটারের মঞ্চ বানান। ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের ওপর নতুন ট্যারিফ ঘোষণা, চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান, এমনকি ন্যাটো বা জি৭ সভাগুলোতেও বাণিজ্যকে চাপপ্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহার—সব মিলিয়ে তাঁর প্রথম বছরটি ছিল বাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য অপ্রত্যাশিত উথাল-পাথাল।


এই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, কঠোর ট্যারিফ নীতি আমেরিকান উৎপাদনকে সুরক্ষা দিচ্ছে। যদিও অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করেছেন ট্যারিফ যুদ্ধের কারণে বিশ্বে সরবরাহ শৃঙ্খল ও পণ্যমূল্য অস্থিতিশীল হতে পারে। বিনিয়োগকারীরাও বারবার চাপে পড়েছেন, কারণ ট্রাম্পের টুইট কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মন্তব্য স্টক মার্কেটের ওঠানামা বাড়িয়ে দিচ্ছিল।


টুইটার ট্রলিং—কৌশল না বিশৃঙ্খলা?
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের মতোই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। সমালোচক, প্রতিদ্বন্দ্বী, মিডিয়া কিংবা বিদেশি নেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ট্রলিং তাঁর পরিচিত স্টাইল—যা আগের চেয়েও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। তাঁর সমর্থকরা বলছেন, এটি “অচল ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি জনগণের ভাষায় কথা বলা।” বিরোধীরা বলছেন, এটি আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি।


তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়—টুইটার ও ট্রুথ সোশ্যালের মাধ্যমে ট্রাম্প একাই সংবাদকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। দিনে যে তিনবার নীতি পরিবর্তন করা হয় কিংবা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পাল্টে দেওয়া হয়—সেটিই তাঁর “স্পেকট্যাকল প্রেসিডেন্সি”-র বিশেষ বৈশিষ্ট্য।


দ্বিধাবিভক্ত আমেরিকা
প্রথম বর্ষপূর্তিতে আমেরিকাকে আগের মতোই গভীর বিভাজনের মাঝে দেখা গেছে। ট্রাম্প একদিকে তাঁর সমর্থকদের কাছে “বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যোদ্ধা” এবং “দেশকে প্রথম রাখার নেতা”—অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি।
জাতীয়তাবাদ ও অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য তাঁর সমর্থক বেসকে দৃঢ় করেছে, কিন্তু শহুরে ও বহু-সাংস্কৃতিক ভোটারদের বিরুদ্ধতা আরও তীব্র করেছে। এতে মার্কিন নির্বাচনী মানচিত্রে আরও মেরুকরণ দেখা গেছে।


স্পেকট্যাকল কি স্থায়ী?
ট্রাম্পের প্রথম বছর শেষে বিশ্লেষকদের বড় প্রশ্ন—এই থিয়েটার-নির্ভর শাসন কতটা স্থায়ী? নীতি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত বিদেশি অংশীদারদের উদ্বিগ্ন করছে, আবার মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে রাখছে সংঘাত ও বিনোদনকে।


তবে এটিও অস্বীকার করা যায় না—ট্রাম্পের এই মডেল আমেরিকান প্রেসিডেন্সির প্রচলিত কাঠামো পাল্টে দিয়েছে। রাষ্ট্রনেতা এখন আংশিকভাবে একজন মিডিয়া পারফর্মারও—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেমন নীতিগত, তেমনই নাটকীয়।


অতএব প্রথম বছরের সারাংশ দাঁড়ায়—ট্যারিফ থেকে ট্রোলিং, মেরুকরণ থেকে মিডিয়া-কমান্ড—ট্রাম্প আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁর শাসন কেবল রাজনীতি নয়, এক ধরনের স্পেকট্যাকল। প্রশ্ন শুধু—এই থিয়েটার কতদিন চলবে এবং এর মূল্য কতটা দিতে হবে আমেরিকাকে, বিশ্বকে।