আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এক অভিনব কূটনৈতিক বার্তার চর্চা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। গত ৪ জুলাই তেহরানে আয়োজিত এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল ভারত, সৌদি আরব, চীন, রাশিয়ার মতো বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি দল। আর ঠিক তখনই এক অদ্ভুত বিষয় নজর কাড়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা যখন খামেনেইর কফিনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সমবেত সকলের জন্য একই প্রার্থনা না পড়ে, আলাদা আলাদা দেশের জন্য পবিত্র কোরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত পাঠ করা হচ্ছিল। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই আয়াত নির্বাচনের পেছনে আসলে লুকিয়ে ছিল ইরানের এক সুক্ষ্ম রাজনৈতিক বার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল সৌদি আরবের প্রতিনিধি দলের আগমনের সময়। তাদের সামনে সূরা আল ইমরানের এমন একটি আয়াত পাঠ করা হয়, যা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বড় যুদ্ধ ‘বদর’-এর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—যেখানে একটি ছোট মুসলিম বাহিনী বিশাল শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। বর্তমান সৌদি আরবের মাটিতেই ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে এই যুদ্ধ হয়েছিল। মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটিকে একদিকে যেমন ইসলামের যৌথ স্মৃতির প্রতি সম্মান হিসেবে দেখা যেতে পারে, তেমনি রিয়াদের প্রতি একটি পরোক্ষ হুঁশিয়ারিও হতে পারে। এর মাধ্যমে ইরান হয়তো বোঝাতে চেয়েছে যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে তারা টিকে গেছে এবং জয়ী হয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ওয়াশিংটনের পক্ষেই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে, হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি বা তালেবানের মতো ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance)-এর ক্ষেত্রে আয়াতগুলোর সুর ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা। যেমন হামাসের প্রতিনিধিদের সামনে পাঠ করা আয়াতে ঈশ্বরের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কথা বলা হয়। আবার হিজবুল্লাহর বেলায় বলা হয় তারা যেন দুর্বল বা শোকগ্রস্ত না হয়, কারণ শেষ পর্যন্ত জয় তাদেরই হবে। লোহিত সাগরে পশ্চিমা জাহাজে আক্রমণ চালিয়ে আলোচনায় থাকা হুতিদের ক্ষেত্রে অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আয়াত পড়া হয়। এর মাধ্যমে ইরান তাদের সামরিক ও আদর্শিক বন্ধুদের পাশে থাকার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

তবে ভারত, রাশিয়া বা চীনের মতো অংশীদারদের ক্ষেত্রে সুর ছিল অনেকটাই নরম ও বন্ধুত্বপূর্ণ। চীনের জন্য পড়া আয়াতে বলা হয়েছে যে চূড়ান্ত বিজয় কেবল ঈশ্বরের তরফ থেকেই আসে, আর রাশিয়ার বেলায় বলা হয় শেষ পরিণতি ধার্মিকদের পক্ষেই যায়। ভারতের প্রতিনিধিদের বেলায় ‘হতাশ বা শোকগ্রস্ত না হওয়ার’ একটি ছোট ও নরম সুরের আয়াত বেছে নেওয়া হয়েছিল। মজার বিষয় হল, ইরান তার পরম বন্ধুদের যেভাবে সম্মান জানিয়েছে, তা তাদের এই আদর্শগত লড়াইয়ের বন্ধুদের চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ বন্ধুদের ধন্যবাদ জানালেও ইরান তাদের নিজের রাজনৈতিক বা সামরিক লড়াইয়ের সমীকরণে টেনে আনেনি। উপরন্তু, সোমবার তেহরানের পক্ষ থেকে ভারতের এই উপস্থিতিকে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের এক মহামূল্যবান নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে ভারতীয়দের এই সহানুভূতি ইরান কখনোই ভুলবে না।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই আয়াত নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও  ব্যাখ্যা দেওয়া না হলেও, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাহিন মোদারেস বিষয়টিকে ‘আয়াতের মাধ্যমে ঠান্ডা লড়াইয়ের ক্রেমলিনোলজি’ বা কূটনীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি বিদেশি প্রতিনিধি দলের জন্য আলাদা আয়াত পড়ে ইরান আসলে একটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সেরে নিয়েছে। যেখানে সৌদি আরবকে পরোক্ষ তিরস্কার কিংবা হিজবুল্লাহ-হামাসকে সান্ত্বনা ও সাহস দেওয়া হয়েছে। অতীতেও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে ইরান এভাবে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে বার্তা দিয়েছে। এবারও খামেনেইর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ধর্মীয় রীতিনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে রূপ নিয়েছিল, যা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের এক অদ্ভুত প্রতিফলন।