আজকাল ওয়েবডেস্ক: পর্যটকদের কাছে ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। একদিকে শান্ত নীল সমুদ্র, অন্যদিকে প্রাচীন মন্দির, ঘন জঙ্গল, বন্যপ্রাণী, সুস্বাদু খাবার, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয় এই দ্বীপপুঞ্জের দেশ।
বালির শান্ত সৈকত থেকে জাভার দুর্গম পাহাড়, সৌন্দর্য ও রোমাঞ্চে ঘেরা দেশ এই ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম আকর্ষণ আগ্নেয়গিরি। আগ্নেয়গিরিগুলি যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনই সুন্দর।
তেমনই এক বিস্ময়কর স্থান হল জাভা দ্বীপের কাওয়া ইজেন। এই আগ্নেয়গিরির ক্রেটার লেককে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী লেক বলে মনে করা হয়। জাভার পূর্বে অবস্থিত কাওয়া ইজেন একটি আগ্নেয়গিরির অংশ।
এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে অ্যাসিডিক ক্রেটার হ্রদ। লাইভ সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হ্রদের কিছু অংশের ক্ষারত্বের মাত্রা ০.৩-এরও নিচে। এই মাত্রা ব্যাটারি অ্যাসিডের সমতুল্য।
অর্থাৎ, এই লেকের জল যেমন চামড়া পুড়িয়ে দিতে পারে তেমনই ধাতু পর্যন্ত গলিয়ে ফেলতে সক্ষম। হ্রদের উজ্জ্বল রংই পর্যটকদের নজর কাড়ে। নীলচে সবুজ রং অন্য কোনও লেকে দেখা যায় না বলেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন দেখতে।
আগ্নেয়গিরির নিচে থাকা উত্তপ্ত ম্যাগমা থেকে নির্গত খনিজ ও অ্যাসিডের কারণেই এই রং। জানা যায়, জলের রং এতটাই উজ্জ্বল যে লেকটিকে নাকি মহাকাশ থেকেও দেখা যায়।
তবে মারাত্মক বিপজ্জনক হলেও লেকটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ওয়ান্ডার ওয়ার্ল্ড নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, এত কম pH মাত্রার কারণে কাওয়া ইজেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষয়কারী প্রাকৃতিক জলাশয়গুলির একটি।
হ্রদে অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান ফেললে সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হয়। পাথর ধীরে ধীরে গলে যায়। কোনও প্রাণী বা মানুষই এই জলে টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ নয়।
লেকের জল আশপাশের ফাটল থেকে নিয়মিত নির্গত হয় বিষাক্ত গ্যাস। যার মধ্যে রয়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং হাইড্রোজেন সালফাইড।
কোনওরকম সুরক্ষা ছাড়া এই গ্যাসের সংস্পর্শে এলে শ্বাসকষ্ট, পক্ষাঘাত এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই পর্যটকেরা সাধারণত গ্যাস মাস্ক ব্যবহার করেন এবং খুব অল্প সময়ের জন্য লেকের কাছে থাকেন।
কাওয়া ইজেনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল উজ্জ্বল নীল আগুন বা ‘ব্লু ফায়ার’। আগ্নেয়গিরির ফাটল দিয়ে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় বেরিয়ে আসা সালফার গ্যাস অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে নীল রঙে জ্বলে ওঠে।
এই নীল আগুনের তাপমাত্রা ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। রাতে এই আগুন সবচেয়ে স্পষ্ট লাগে। দিনের আলোয় সূর্যের কারণে রং ফিকে হয়ে যায়।
তাই বেশিরভাগ পর্যটকই মধ্যরাতে ট্রেক শুরু করে ভোরের আগে পৌঁছন, যাতে অন্ধকারে নীল আগুন দেখা যায়। তবে এই কাওয়া ইজেন অনেকের কর্মক্ষেত্রও বটে।
এখানকার শ্রমিকেরা ক্রেটারের তলা থেকে জমাট বাঁধা সালফার তুলে আনেন। গরম গ্যাস ঠান্ডা হয়ে তরলে পরিণত হয় এবং পরে শক্ত হয়ে উজ্জ্বল হলুদ সালফারে রূপ নেয়।
শ্রমিকদের কাজ সালফার ভেঙে ঝুড়ি বোঝাই করা। প্রতিটি ঝুড়ির ওজন ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। তবে এত বিপদ সত্ত্বেও, ওয়ান্ডার ওয়ার্ল্ডের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ৩০০ পর্যটক কাওয়া ইজেনে আসেন।
মূল আকর্ষণ নীল আগুন ও হ্রদের অদ্ভুত রং। সাধারণত মধ্যরাতে ট্রেক শুরু হয় এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত চলে। বেস ক্যাম্পে গ্যাস মাস্ক ভাড়াও পাওয়া যায়।
তবে পর্যটকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়, কারণ গ্যাসের মাত্রা হঠাৎ বদলে যেতে পারে। তবুও এই অ্যাসিড লেকের টান মানুষকে বারবার এখানে নিয়ে আসে। পর্যটকদের কাছে এটা অন্য অভিজ্ঞতা হলেও স্থানীয়দের কাছে এই কাওয়া ইজেন জীবিকা নির্বাহের লড়াই।
