আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহেই ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কার্যত জিতে গেছে আমেরিকা। কিন্তু বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পারস্য উপসাগর অঞ্চলের একের পর এক নতুন হামলার ঘটনা সেই দাবিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইরাকের দক্ষিণ উপকূলের কাছে একাধিক জাহাজে হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ আবারও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাতের অন্ধকারে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বন্দর শহর বাসরা-র কাছাকাছি ইরাকি জলসীমায় অন্তত দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা হয়। ইরাকি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের বিস্ফোরকবাহী ছোট নৌকা ব্যবহার করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।
উপকূল থেকে তোলা এবং রয়টার্স যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, জাহাজ দু’টি বিশাল আগুনের গোলায় পরিণত হয়েছে। আকাশের অন্ধকার ভেদ করে কমলা রঙের বিশাল আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ছে। এই হামলায় অন্তত একজন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বৃহস্পতিবারের আগেই উপসাগর অঞ্চলে আরও তিনটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps নিজেই জানিয়েছে, তাদের একটি অভিযান ছিল একটি থাই মালবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ওই জাহাজ ইরানি বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করেছিল। এরপর সেটিতে হামলা চালানো হয় এবং আগুন ধরে যায়।
এছাড়া আরেকটি কনটেইনারবাহী জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরশাহ কাছাকাছি একটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল দুই সপ্তাহ আগে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা তৈরি করেছে। নতুন হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সপ্তাহের শুরুতে যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার পর তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার আবার তা বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ ইরানের হুমকি— তারা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দিতে পারে।
এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং তরল গ্যাসের বড় অংশ চলাচল করে।
তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— যতদিন পর্যন্ত আমেরিকা ও ইজরায়েল তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ না করবে, ততদিন এই পথ দিয়ে তেল চলাচল করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও আলোচনাতেও তারা বসবে না বলে জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে। উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশের আকাশে নতুন ড্রোন ঢোকার খবর পাওয়া যায়।কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহ, বাহরাইন এবং ওমান— এই পাঁচ দেশের আকাশসীমায় ড্রোন ঢোকার খবর আসে। এর ফলে মার্কিন ও ইজরায়েলি দাবি— ইরানের দূরপাল্লার হামলার ক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে— সেই দাবি নিয়ে নতুন করে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংকও সতর্ক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
সিটি ব্যাংক সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে তাদের শাখা সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ইরান সতর্ক করে বলেছিল— ব্যাংকগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এবং বাসিন্দাদের ব্যাংকের ভবন থেকে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে HSBC ইতিমধ্যেই কাতারে তাদের শাখা বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে বড় বড় উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো বুধবার একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। তারা সম্মিলিতভাবে তাদের মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে। এর প্রায় অর্ধেকই আসবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল ভাণ্ডার থেকে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই তেল বাজারে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগবে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যে তেল পরিবহন হয় তার মাত্র তিন সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
