আজকাল ওয়েবডেস্ক: যন্ত্র কি কখনও সচেতন হতে পারে—এই প্রশ্ন একসময় শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। আজ তা কর্পোরেট বোর্ডরুম থেকে জনপরিসরের বিতর্কে ঢুকে পড়েছে। চ্যাটবট সাবলীল ভাষায় কথা বলে, গাড়ি নিজে নিজে চলে, সফটওয়্যার নানা সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেয়। ফলে অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, পর্দার ওপাশে থাকা কোনও কিছুর কি আদৌ নিজস্ব চেতনা আছে?


কিন্তু এই অনুভূতির ভিত খুবই নড়বড়ে। এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার মতো কোনও উপকরণ এখনও আমাদের হাতে নেই। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক ড. টম ম্যাকলেল্যান্ডের মতে, এমন উপকরণ হয়তো বহুদিন বা কখনওই পাওয়া যাবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চেতনার প্রসঙ্গে সবচেয়ে সৎ অবস্থান হতে পারে, আমরা আসলে কত কম জানি, তা স্বীকার করা।


মানুষের ক্ষেত্রেই চেতনা নির্ধারণের কোনও সর্বজনস্বীকৃত পরীক্ষা নেই, সেখানে সফটওয়্যারের কথা তো দূরের। কোনও স্ক্যান, সিগন্যাল বা চেকলিস্ট দেখিয়ে বলা যায় না—এখানেই সচেতনতা জন্ম নিয়েছে।


ড. ম্যাকলেল্যান্ডের যুক্তি, এটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং আরও গভীর এক সংকটের ইঙ্গিত। আমরা এখনও জানি না, চেতনা আসলে কী, বা কোন প্রক্রিয়ায় তা তৈরি হয়। এই ভিত্তি ছাড়া যন্ত্র সচেতন কিনা নির্ধারণ করা নিছক অনুমান ছাড়া কিছু নয়। তাই আপাতত, এমনকি ভবিষ্যতেও, অনিশ্চয়তাই একমাত্র অবস্থান।


এআই অধিকার নিয়ে অনেক বিতর্কে ধরে নেওয়া হয়, চেতনাই নৈতিকতার মূল সীমারেখা। কিন্তু ড. ম্যাকলেল্যান্ড এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, শুধু সচেতনতা থাকলেই নৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয় না। এখানে আরও নির্দিষ্ট একটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ—সেন্টিয়েন্স বা অনুভবক্ষমতা।


চেতনা থাকলে এআই উপলব্ধি ও আত্মসচেতনতা পেতে পারে, কিন্তু সেটি নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থাও হতে পারে। সেন্টিয়েন্স আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। এতে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার মতো অভিজ্ঞতা জড়িত। এই অভিজ্ঞতাই কাউকে কষ্ট পাওয়ার বা আনন্দ পাওয়ার সক্ষমতা দেয়, আর তখনই নৈতিকতার প্রশ্ন আসে।


কিছু গবেষকের বিশ্বাস, সঠিক কম্পিউটেশনাল কাঠামো তৈরি হলেই চেতনা নিজে থেকেই উদ্ভূত হবে। তাঁদের মতে, নিউরন না সিলিকন—মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কাঠামোই মূল। আবার অন্যরা মনে করেন, চেতনা নির্দিষ্ট জৈব প্রক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, যা জীবন্ত শরীর ছাড়া সম্ভব নয়। ডিজিটাল অনুকরণ যত নিখুঁতই হোক, তা অভিজ্ঞতা নয়, শুধু অনুকরণই থাকবে।


দৈনন্দিন জীবনে আমরা সচেতনতা বিচার করি অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভর করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা মোটামুটি কাজ করে। সমস্যা হল, এই সাধারণ বোধ গড়ে উঠেছে প্রাণীর জগতে, অ্যালগরিদমের জগতে নয়। যন্ত্র এমনভাবে নড়ে, সাড়া দেয় বা প্রকাশ পায় না, যেভাবে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি বুঝতে শেখানো হয়েছে। ফলে এআইয়ের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি বিভ্রান্তিকর হতে পারে।


কঠোর বৈজ্ঞানিক তথ্যও আমাদের উদ্ধার করে না। স্নায়ুবিজ্ঞান এখনও মানুষের চেতনাই পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনি, যন্ত্রের ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই নেই। আমরা জানি না, আর হয়তো কখনওই জানতে পারব না।