আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাংবাদিক মুহাম্মদ আসলাম শাহের গ্রেপ্তার ও জেল হওয়ার ঘটনায়। বিতর্কিত প্রিভেনশন অব ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্ট (পেকা) ২০২৫-এর অধীনে গ্রেপ্তার হওয়ার একদিন পর তাকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে, যা দেশটিতে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনসিসিআইএ) আসলাম শাহকে করাচির দক্ষিণাঞ্চলের এক বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করে এবং ১৪ দিনের শারীরিক রিমান্ড চায়। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট সেই আবেদন খারিজ করে দেন এবং সাংবাদিককে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আসলাম শাহের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয় গত ২৯ ডিসেম্বর। অভিযোগকারী তাবিশ রাজা হুসনাইন, যিনি করাচি ওয়াটার অ্যান্ড স্যুয়ারেজ কর্পোরেশনের (কেডব্লিউএসসি) এক কর্মকর্তা বলে পরিচিত। পাকিস্তানের শীর্ষ দৈনিক ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফআইআরে পেকা আইনের ২০ নম্বর ধারা (ব্যক্তির মর্যাদাহানির অপরাধ) এবং ২৪ নম্বর ধারা (সাইবার স্টকিং) প্রয়োগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে হুসনাইন ও এক সিনিয়র কর্মকর্তা কর্নেল অঞ্জুমের বিরুদ্ধে “মানহানিকর প্রচার” চালিয়েছেন এবং অশালীন ভাষা ব্যবহার করে তাদের মানসিক ক্ষতি ও সুনামের ক্ষতিসাধন করেছেন।
এই গ্রেপ্তার এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তানে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মহল বারবার সতর্ক করে আসছে। গত নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) এক বিবৃতিতে পাকিস্তানে সাংবাদিকদের জন্য “গভীরতর সংকট”-এর কথা তুলে ধরে। সেখানে টার্গেট করে হত্যা, পেকা আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ, অঘোষিত সেন্সরশিপ, রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির হয়রানি, জোর করে ছাঁটাই এবং বেতন না পাওয়ার মতো সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই উদ্বেগ আন্তর্জাতিক স্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে, যেখানে পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের (পিএফইউজে) একটি প্রতিনিধি দল আইএফজে-র সভাপতি ডমিনিক প্রাদালি এবং মহাসচিব অ্যান্থনি বেলাঞ্জারের সঙ্গে আলোচনা করে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ফরাসি সাংবাদিক ইউনিয়ন সিন্ডিকেট ন্যাশনাল দে জার্নালিস্টসের সদর দপ্তরে। আলোচনায় পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
আইএফজে-র এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সংগঠনটির নেতৃত্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতির কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চাওয়ার পথেও যেতে পারে আইএফজে।
বৈঠকে পিএফইউজে প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব শাকিল আহমেদ, রাওয়ালপিন্ডি–ইসলামাবাদ ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসের সভাপতি তারিক উসমানি এবং বৈদেশিক কমিটির প্রধান ওয়াসিম শাহজাদ কাদরি। তারা দেশজুড়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এবং আইনি হয়রানির এক অন্ধকার চিত্র তুলে ধরেন।
যৌথ বিবৃতিতে প্রাদালি ও বেলাঞ্জার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পেকা আইনের আওতায় নেওয়া পদক্ষেপকে “অবৈধ” বলে নিন্দা করেন এবং অবিলম্বে এই ধরনের মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। তারা সাংবাদিকদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়ন, টার্গেট করে হত্যার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত “অঘোষিত সেন্সরশিপ” বন্ধের দাবি জানান যাকে তারা অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেন।
মিডিয়া শিল্পে জোর করে ছাঁটাই নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএফজে। সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলা তথাকথিত “অর্থনৈতিক হত্যাকাণ্ড” বন্ধে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। পিএফইউজের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আইএফজে জানিয়েছে, আসন্ন কংগ্রেসে পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটি জোরালোভাবে তোলা হবে যার ফলে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
