আজকাল ওয়েবডেস্ক: হরমুজ প্রণালী নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এই পরিস্থিতিতে ইরান আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিগত এক মাসের সামান্য বেশি সময়ে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হারিয়েছে। তবুও তেহরান পিছু হটতে নারাজ। আর এতেই আশঙ্কা দানা বেঁধেছে যে, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি স্থল-আক্রমণে রূপ নিতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। এরপরই ইরান নজিরবিহীন মাত্রায় আমেরিকার হামলা ঠেকাতে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। লাখ লাখ ইরানি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নাম লেখাচ্ছেন, শিশুদেরও সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রতিরক্ষার শেষ ভরসা হিসেবে ইরান কর্তৃপক্ষ দেশবাসীদের নিয়ে 'মানব-শৃঙ্খল' তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আমেরিকা ও ইজরায়েল যদি স্থলপথে আক্রমণ চালায়, তবে দেশের হয়ে লড়াই করতে ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি দেশবাসী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। কারণ গত ২ এপ্রিল ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছিলেন যে, তখন পর্যন্ত ৭০ লাখ মানুষ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এগিয়ে এসেছিল।

ইরানের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানোর (এসএমএস) মাধ্যমে জনগণকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার অবসরপ্রাপ্ত সেনাদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।

যুদ্ধে শিশুদের ব্যবহার করছে ইরান
আধা-সামরিক বাহিনী 'রিভল্যুশনারি গার্ড'-এর সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী শাখা 'বাসিজ' এখন মাত্র ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও তাদের বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে যে, এই শিশুদের কারো কারো হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটি শিশুদের এভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করাকে 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে অভিহিত করেছে।

তেহরানে কর্মরত রিভল্যুশনারি গার্ডের একজন সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা রহিম নাদালি জানিয়েছেন যে, 'ফর ইরান (ইরানের জন্য)' নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে এমন সব অংশগ্রহণকারীদের নিয়োগ করা হচ্ছে, যারা টহল কার্যক্রম, তল্লাশি, চৌকি পরিচালনা এবং রসদ সরবরাহের মতো কাজে সহায়তা করবে। 'শিশু অধিকার সনদ'-এর প্রতি ইরানের অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও দেশটি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে! অথচ ওই সনদ অনুযায়ী সামরিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 

রহিম নাদালি বলেন, "যেহেতু যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এগিয়ে আসছে, তাদের বয়সের গড় ক্রমশ কমে আসছে এবং তারা নিজেরাও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে, তাই আমরা সেনাবাহিনীতে যোগদানের ন্যূনতম বয়সসীমা কমিয়ে ১২ বছর নির্ধারণ করেছি।" তিনি আরও জানান যে, এখন থেকে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী শিশুরাও চাইলে এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে।

ইরানের একজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যেন সকলে তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠিয়ে দেন। চলমান যুদ্ধে সম্মুখসারির ভূমিকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করার এটাই হল সর্বশেষ নজির। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অধীনস্থ বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়ার সঙ্গে যুক্ত জেনারেল হোসেন ইয়েকতা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই মন্তব্য করেছেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে।

জেনারেল হোসেন ইয়েকতা বলেছেন, "মা-বাবারা, আপনারা আপনাদের সন্তানদের হাত ধরুন এবং রাস্তায় নেমে আসুন। আপনারা কি চান আপনাদের সন্তান একজন সত্যিকারের পুরুষ হয়ে উঠুক? তাকে যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে একজন বীরের মতো অনুভব করতে দিন। মা-বাবারা, রাতে আপনাদের সন্তানদের চেকপয়েন্টগুলোতে পাহারার কাজে পাঠান। এতেই তারা পুরুষ হয়ে উঠবে!"

উল্লেখ্য, বাসিজের চেকপয়েন্টগুলো বারবার বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

হামলা প্রতিহত করতে মানবশৃঙ্খল
ইরানি শাসনব্যবস্থা তাদের অসামরিক নাগরিকদের (তরুণ, শিল্পী এবং ক্রীড়াবিদরা অন্তর্ভুক্ত) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ৭ই এপ্রিল দেশজুড়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সামনে মানবশৃঙ্খল গঠন করে। এর উদ্দেশ্য হল, জন-পরিকাঠামো লক্ষ্য করে আমেরিকার সম্ভাব্য কোনও হামলা প্রতিহত করা। এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এল, যখন ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালী যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরোপুরি সচল না হয়, তবে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবেন।

এই পরিকল্পনার ঘোষণা দিতে গিয়ে এবং নাগরিকদের উৎসাহিত করতে গিয়ে ইরানের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপমন্ত্রী আলিরেজা রাহিমী 'এক্স' প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, "আমরা একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে এই বার্তা দেব যে- জন-পরিকাঠামোতে হামলা চালানো একটি যুদ্ধাপরাধ।"

ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, "উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ইরানের তরুণদের মানবশৃঙ্খল" শীর্ষক এই উদ্যোগটির লক্ষ্য হল, "আগ্রাসনকারীদের" বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রতি সংহতি ও সমর্থন প্রদর্শন করা।

ইরানকে নতি স্বীকার করাতে মরিয়া ট্রাম্প। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সোমবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, যদি তার বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া না হয়, তবে তেহরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সেতুগুলোর ওপর হামলা চালানো হবে।

ট্রাম্প 'ট্রুথ' প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে লিখেছেন, 'মঙ্গলবার হবে 'বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিবস' এবং 'সেতু দিবস' - সবকিছু একই দিনে। এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি!!! ওই শালা হরমুজ প্রণালীটা খুলে দে তোরা, ওরে উন্মাদ জারজগুলো, নইলে তোদের নরকবাস করতে হবে - শুধু চেয়ে দেখিস! আল্লার প্রশংসা হোক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।'

এদিকে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রচেষ্টা একটি "সংকটপূর্ণ ও সংবেদনশীল পর্যায়ে" প্রবেশ করেছে বলে পাকিস্তান দাবি করলেও, দুই পক্ষের মধ্যে বৈরী পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।

লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলের চালানো দু'টি পৃথক বিমান হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস-এর অভ্যন্তরীণ সূত্র উদ্ঋত করেপ্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম ইরাকের আল-কাইম এলাকায় অবস্থিত ‘১৩তম ব্রিগেড’-এর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে অন্তত সাতটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনীর চালানো রাতের বেলার হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তেহরানের পূর্বে অবস্থিত পারদিস এলাকার ধ্বংসস্তূপ থেকে ছ'জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শাহরিয়ারের একটি আবাসিক এলাকায় চালানো বিমান হামলায় ন'জন নিহত হয়েছেন, যা এই সংঘাতে অসামরিক হতাহতের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধির বিষয়টিকেই জোরালোভাবে তুলে ধরে।