আজকাল ওয়েবডেস্ক: রবিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য দেশবাসীর মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম, ভোজ্য তেল এবং পেট্রোল-ডিজেলের সংযমী ব্যবহার থেকে বিদেশযাত্রায় হ্রাস টানার মতো একাধিক পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি, বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডার সংরক্ষণের জন্য এক বছর সোনা কেনার উপরেও একরকম নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছেন। এর পিছনে বৃহত্তর আর্থিক উদ্বেগই কাজ করছে বলে মতামত বিশেষজ্ঞদের।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারত সোনা এবং অপরিশোধিত তেল- দু'টিই মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করে। যার দাম মার্কিন ডলারের মাধ্যমে মেটানো হয়। ভারত প্রায় ৮৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা আমদানিকারক ভারত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি যদি সোনার আমদানিও বাড়ে, তা হলে দেশকে আরও বেশি করে ডলার খরচ করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ বাড়বে এবং টাকার মূল্য কমতে শুরু করবে।

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং আরবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার প্রায় ৬৯১ বিলিয়ন ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে এটি ৭২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলেও এপ্রিলের মধ্যে তা অনেকটাই কমেছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের চলতি খাতের ঘাটতি বেড়ে ৮৪.৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা জিডিপি-র প্রায় ২ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে ডলারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে।  

পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, চলতি অর্থবর্ষে ভারতের মোট আমদানির প্রায় ১০ শতাংশই হলো সোনা। অর্থাৎ যদি সোনার আমদানি ৩০-৪০% কমে, তা হলে প্রায় ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার বাঁচবে। অন্য দিকে, যদি আমদানি ৫০% কমে, তা হলে সাশ্রয় হবে ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা গেলে ভারতের চলতি খাতের ঘাটতির প্রায় অর্ধেক পূরণ করা যাবে। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এই বেঁচে যাওয়া ডলার দিয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনাও সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মত, বিদ্যুৎ, শিল্পক্ষেত্রের জন্য অত্যাবশ্যক পণ্য অপরিশোধিত তেল। তবে সোনাকে মূলত সঞ্চয় অথবা বিয়ে বা অন্য কোনও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঐচ্ছিক খরচের অংশ হিসেবে দেখা হয়। তেল কেনা দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, সোনা কেনা অনেকটা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বা বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী মোদির দাবি, এই সঙ্কটকালে ভারতীয়রা যদি সোনা কেনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে, তবে বিদেশে ডলারের মাধ্যমে কেনাকাটা কম হবে। বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারও রক্ষা করা সম্ভব হবে। ডলারের মাধ্যমে কেনাকাটা কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার দাম স্থিতিশীল থাকবে।

 

বিশ্বজুড়ে আর্থিক চাপানউতোরের সময়ে ভারত এর আগেও নানা ভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে। অতীতে সরকার সোনার উপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো, আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সোনার পরিবর্তে গোল্ড বন্ডের মতো বিকল্প বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছিল। তখনও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা এবং টাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই সরকারের উদ্দেশ্য ছিল।

 

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ ভাবে হামলা করে ইরানে। বর্তমানে সংঘর্ষবিরতি চললেও আমেরিকা ও ইরান, দুই দেশই মাঝেমধ্যে নানা অজুহাতে তা লঙ্ঘন করছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সঙ্কট অব্যাহত। গত দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে ভারত বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার হায়দরাবাদে একাধিক এক অনুষ্ঠান থেকে মোদী দেশবাসীর কাছে জ্বালানি সাশ্রয় ও বিদেশি মুদ্রা সংরক্ষণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে, জনসাধারণকে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর এড়িয়ে চলা, এক বছরের জন্য সোনা কেনায় হ্রাস, পেট্রোল-ডিজেলের সংযত ব্যবহার এবং যথাসম্ভব 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বা বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি, গাড়ির বদলে গণপরিবহণ বা কারপুল ব্যবহার করার আর্জিও জানান।