আজকাল ওয়েবডেস্ক: গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন কুয়ো আর পুকুর শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, তখনই আমরা জলের আসল মূল্য বুঝতে পারি। চাষবাসের ওপর নির্ভরশীল ভারতের গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে জলের এই সংকট শুধুমাত্র একটি সমস্যা নয়, বরং জীবন-জীবিকার এক বড়সড় লড়াই। এই কঠিন বাস্তবকে সামনে রেখেই ছত্তিশগড়ের মহাসমুন্দ জেলার গ্রামবাসীরা এমন এক নজিরবিহীন কাজ করে দেখিয়েছেন, যা জল সংরক্ষণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মাত্র ১৫ দিনের চেষ্টায়, কোনও বড় সরকারি প্রজেক্ট ছাড়াই, স্রেফ নিজেদের উদ্যোগে তারা বাঁচিয়ে ফেলেছেন প্রায় ৩১ কোটি লিটার জল।
মহাসমুন্দ জেলায় বছরের পর বছর ধরে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নামছিল। খরিফ ও রবি— দুই মরসুমেই ব্যাপক ধান চাষের কারণে মাটির তলার জলের ওপর চাপ বাড়ছিল প্রতিনিয়ত। প্রতি বছরই গরমের সময় জলের তীব্র হাহাকার দেখা দিত এলাকায়। এই পরিস্থিতি বদলাতে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা একজোট হয়ে শুরু করেন ‘মেরা গাঁও, মেরা জল ২.০’ (আমার গ্রাম, আমার জল) অভিযান। লক্ষ্য ছিল একটাই, জল সংরক্ষণকে স্রেফ একটা সরকারি কর্মসূচি না রেখে সাধারণ মানুষের নিজস্ব আন্দোলনে পরিণত করা।
এরপরই শুরু হয় এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ। জেলার ৫৫১টি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত ১,১৪০টিরও বেশি গ্রামের মানুষ স্বেচ্ছায় শ্রমদানে এগিয়ে আসেন। গত ১৪ মে থেকে ৩০ মে— এই মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে ৩ লক্ষ ৪১ হাজারেরও বেশি জল সংরক্ষণের কাঠামো তৈরি করেন। এর মধ্যে ছিল বৃষ্টির জল ধরে রাখার গর্ত (সোক পিট), নালা, ছোট চেক ড্যাম এবং নতুন পুকুর খনন। গ্রামের পুরুষ, মহিলা থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা প্রত্যেকে এই কাজে শামিল হন।
যেমন আরন্দ গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা শঙ্কর লাল যাদব জানালেন, তারা প্রথমে গ্রামসভায় জলের সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন প্রতিটি বাড়িতে একটি করে ‘সোক পিট’ বা জল শোষণের গর্ত তৈরি করা হবে। আজ সেই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এই ব্যবস্থা রয়েছে, যা বৃষ্টির জলকে ড্রেনে বয়ে যেতে না দিয়ে সরাসরি মাটির তলায় পাঠাতে সাহায্য করছে।
এই যৌথ প্রচেষ্টার ফল মিলল হাতেনাতে। মরসুমের প্রথম বৃষ্টি আসতেই দেখা গেল, যে জল আগে অনায়াসে ড্রেন আর নদী দিয়ে বয়ে নষ্ট হয়ে যেত, তার প্রায় ৩১ কোটি লিটার বা ৩১০০ লক্ষ লিটার জল এই কাঠামোগুলোর মাধ্যমে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। জেলা কালেক্টর বিনয় কুমার ল্যাঙ্গে জানিয়েছেন, কৃষি, বন এবং পঞ্চায়েত দপ্তরের সাথে আমজনতার এই মেলবন্ধনই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। মহাসমুন্দের এই মডেল প্রমাণ করে দিল, প্রশাসন আর সাধারণ মানুষ যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে, তবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর জলের সংকটের মতো বড় সমস্যাকেও অনায়াসে হারিয়ে দেওয়া যায়।















