আগরতলা: বাণিজ্য থেকে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, একাধিক বিষয়ে, রাজ্যের উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা‌ঃ মানিক সাহা। মাত্র ছ'বছরে সে রাজ্যের জিএসডিপি (গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) দ্বিগুণ হয়েছে সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ত্রিপুরা দেশের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল রাজ্যগুলির মধ্যে একটি। অন্যদিকে, ত্রিপুরার শিক্ষাব্যবস্থার  অগ্রগতিতে, সম্প্রসারণে এবার রাজ্য সরকারের সঙ্গে হাতে হাতে মিলিয়ে এগিয়ে চলার জন্য, মউ সাক্ষর করল টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, এর আগেই ত্রিপুরায় পৌঁছে গিয়েছে টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ। সেখানে রাজ্যের প্রথম বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তৈরি করে টেনকো ইন্ডিয়া গ্রুপই। দীর্ঘ কয়েক দশকের পথ চলার কথা উঠে এসেছে টেকনো  ইন্ডিয়া গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সত্যম রায়চৌধুরীর কথাতেও। তবে, এবার লক্ষ্য আরও বড়। সমগ্র রাজ্য জুড়েই, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপশি, স্কুল স্তরেও কাজ করতে চলেছে টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ। নজর অ্যাগ্রিকালচার, আইটি বিভাগেও। সত্যম রায়চৌধুরী বলেন, 'গত  কয়েকবছর ধরে ত্রিপুরার অগ্রগতির সাক্ষী। ত্রিপুরা উত্তর পূর্বের উন্নয়নের অন্যতম কান্ডারী। যেভাবে এই রাজ্যের শিক্ষা সংস্কৃতির অগ্রগতি ঘটছে, আমরা, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ, সেই অগ্রগতির ধারায় উল্লেখ্যযোগ্যভাবে অংশগ্রহণ করছি এবং করব।' 

টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা বলেন, 'আমার মনে হয়, এতে আগামী দিনে ত্রিপুরার উন্নয়নে, নতুন দিশা দেখা দেবে।' ত্রিপুরার কৃষিমন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, 'টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ আমাদের রাজ্যে আগেই এসেছে। তাদের কলেজ আছে, ইউনিভার্সিটি আছে।' এখন বিভিন্ন জেলার কৃষকদের ট্রেনিং দেওয়া  নিয়ে আরও বড় পরিকল্পনা টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের, মন্ত্রীর কথায় উঠে আসে তা। অন্যদিকে ত্রিপুরার উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী কিশোর বর্মণ বলেন, 'ডিজিটাল এডুকেশন, এআই বেস, স্কিল সেক্টর, টেকনোলজি সেক্টর, নানা খাতে, জাতীয় শিক্ষা নীতিকে সামনে রেখে, রাজ্য জুড়ে নিজেদের কাজ আরও বর্ধিত করবে।' 'ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬'- এ টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর কৌশিক সরকার, চারটি মউ সাক্ষর করেন। 

'ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬'-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা‌ঃ মানিক সাহা বলেন, 'কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার জাতীয় সড়ক, রেলওয়ে, বিমানবন্দর, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ, জলপথ এবং একটি বিস্তৃত ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কের মতো পাবলিক অবকাঠামোতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। আমাদের কাছে প্রাকৃতিক গ্যাস, রাবার বাগান, জিআই-ট্যাগযুক্ত কুইন আনারস, প্রিমিয়াম আগরউড, বিভিন্ন ধরণের বাঁশ জাতীয় দ্রব্য এবং সমৃদ্ধ উদ্যান ক্ষেত্র রয়েছে।'  এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।

ডা‌ঃ মানিক সাহা আরও বলেন, 'ত্রিপুরা তৃতীয় সম্পূর্ণ সাক্ষর রাজ্য যেখানে প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এবং দক্ষ জনশক্তি রয়েছে। এখন, শক্তিশালী পরিকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা নেওয়ার লক্ষ্যে বেসরকারী বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত সময়। সেই কারণে আমরা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ৪৫টি দপ্তর এবং সংস্থার অংশগ্রহণে এই বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন একটি বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করেছি। এই বিজনেস কনক্লেভে ৫০০'র অধিক ব্যবসায়ী নেতা, প্রোমোটার, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তা এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছেন। প্রাকৃতিক সম্পদ, সর্ব-আবহাওয়া সংযোগ এবং ব্যবসা-বান্ধব নীতি ত্রিপুরাকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের গন্তব্যে পরিণত করেছে। আমরা ভূমি, নগর পরিকল্পনা, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন এবং অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক নীতি সংস্কার করেছি।'

আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে,'রিফর্ম এক্সপ্রেস' বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে ডিরেগুলেশন এবং কমপ্লায়েন্স রিডাকশন প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ত্রিপুরা সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। আমরা ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তনের পদ্ধতিগুলিকে সরলিকৃত করেছি, শিল্প ও ব্যবসার অনুমতি সমূহ সুবিন্যস্ত করেছি, একক উইন্ডো পোর্টাল SWAAGAT তৈরি করেছি এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক পরিদর্শন চালু করেছি। সামাজিক, শিক্ষাগত এবং বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলির জন্য খুব মাঝারি হারে সরকারি জমি লিজে দেওয়া হয়। আমরা এমন কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে একটি যারা সমস্ত শিল্প ও ব্যবসা-সম্পর্কিত অনুমোদন ইস্যু করে।'

ত্রিপুরায় গত এক বছরে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, সেই তথ্যও তুলে ধরেন মানিক সাহা। প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, 'আমাদের ১,৫৮,০০০ হেক্টর প্রাকৃতিক রাবার বাগান রয়েছে, যা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। শান্তিরবাজারে একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের ব্যবস্থা সহ একটি নতুন রাবার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মানসম্পন্ন রাবার উৎপাদন, সেন্ট্রিফিউজড ল্যাটেক্স পণ্য, ফোম, সার্জিক্যাল, শিল্প এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর কাঠ ও গ্লাভস সহ কাঠের তৈরি নানা জিনিসপত্র তৈরি করা যেতে পারে। রাবার ভিত্তিক শিল্প, প্লাইউড তৈরি সহ রাবার ভিত্তিক নানা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে, আমরা ৪৫,০০০ হেক্টর জমিতে শিল্প বাঁশ চাষ সম্প্রসারিত করছি এবং উনকোটিতে একটি সমন্বিত বাঁশ ভ্যালু চেইন পার্ক স্থাপন করছি। ২.২৭ কোটি আগর গাছ সহ ত্রিপুরায় ভারতের শীর্ষস্থানীয় এবং সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আগর বাস্তুতন্ত্র রয়েছে।'

আগর ভিত্তিক বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী উৎপাদনে বড়সড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে ত্রিপুরায়, 'ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬'-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে সে প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন মানিক সাহা । বলেন, 'কৃষি এবং উদ্যান ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাতের মধ্যে রয়েছে- কোল্ড চেইন অবকাঠামো, টিস্যু কালচার সুবিধা, আনারস এবং কাঁঠাল প্রক্রিয়াকরণ, ফাইবার নিষ্কাশন, ডিহাইড্রেটেড ফল প্রক্রিয়াকরণ, এবং চালের তুষ এবং তুষ তেল ইউনিট. ফিশ ফিড উৎপাদন কেন্দ্র, ক্লাস্টার ভিত্তিক মাছ চাষ ও শুকনো মাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছের বাজার এবং ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড এবং অ্যাকোয়া ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠা। আমরা একটি এনার্জি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছি যা টেকসই, প্রযুক্তি-চালিত এবং বিনিয়োগ-বান্ধব।' ত্রিপুরার কৌশলগত অবস্থান, বাংলাদেশের সঙ্গে এই রাজ্যের ৮৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত, এটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার করে তুলছে। তিনি এদিন বলেন,'আগরতলা-আখাউড়া আন্তর্জাতিক রেল সংযোগ, মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসাবে গড়ে তোলা, চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সাব্রুমকে সংযুক্তকারী মৈত্রী সেতু এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সোনামুড়া-দাউদকান্দি অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন রুট একটি নির্বিঘ্ন মাল্টিমডাল পরিবহন ও লজিস্টিক ইকোসিস্টেমের জন্য বাস্তব সুযোগ।ত্রিপুরায় লজিস্টিক পার্ক, গুদামজাতকরণ, কোল্ড-চেইন পরিকাঠামো, মাল্টিমোডাল কার্গো হাব, বৈদ্যুতিক গতিশীলতা, বাণিজ্যিক পাইলট প্রশিক্ষণ এবং বিমান রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশল, হেলিপোর্ট এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা এবং ডম্বুর লেকে সী-প্লেন অপারেশনে প্রচুর সুযোগ রয়েছে।' 

       ত্রিপুরা সরকার রাজ্যকে স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, জৈবপ্রযুক্তি এবং চিকিৎসা উদ্ভাবনের জন্য একটি নেতৃস্থানীয় কেন্দ্রে রূপান্তর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এই প্রসঙ্গও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'ত্রিপুরা আইটি ও ডেটা ইকোসিস্টেম জোন (টিআইডিইজেড), ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন পার্ক এবং একটি অত্যাধুনিক আইটি পার্কের মতো বড় পরিকাঠামো সমন্বিত প্রকল্প গড়ে তুলছে। আমি আনন্দিত যে ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভে ৭০০'র অধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন এবং ২৫০টিরও অধিক MOU(মউ) স্বাক্ষরিত হচ্ছে, যার বিনিয়োগের লক্ষ্য প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। 'টিম ত্রিপুরা'-এর সক্রিয় সমর্থনের সঙ্গে, আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে এই সমঝোতা স্মারকগুলির অধিকাংশই অদূর ভবিষ্যতে সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে।'