আজকাল ওয়েবডেস্ক:  ভারতে ক্রমবর্ধমান খ্রিস্টান-বিদ্বেষী হিংসার বিরুদ্ধে সরব হলো সিভিল সোসাইটি সংগঠন ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম (UCF)। সম্প্রতি ভ্যাটিকানের বিদেশমন্ত্রী আর্চবিশপ পল রিচার্ড গ্যালাঘারের হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দিয়েছে সংগঠনটি, যাতে ভারতের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর চলমান লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। ভ্যাটিকান মন্ত্রী বর্তমানে এক সপ্তাহব্যাপী ভারত সফরে রয়েছেন, যার উদ্দেশ্য দেশের বিভিন্ন চার্চ ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা। গত সপ্তাহে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় জয়শঙ্কর লেখেন, “আর্চবিশপ গ্যালাঘারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খুশি হলাম। বিশ্বাসের গুরুত্ব এবং দ্বন্দ্ব নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।”

তবে ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরামের মতে, ভারতের বাস্তব চিত্র অনেক উদ্বেগজনক। জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ৮৩৪টি বিদ্বেষমূলক অপরাধ ঘটেছে, যেখানে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩৪। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল মাত্র ১২৭ – অর্থাৎ মোদি শাসনের এক দশকে এই হিংসার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্মারকলিপিতে ইউসিএফ দাবি করেছে, “ভারতে প্রতিদিন গড়ে দুইজন খ্রিস্টান শুধুমাত্র ধর্মচর্চার জন্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এই আক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে মিথ্যা ধর্মান্তরের অভিযোগকে ব্যবহার করা হচ্ছে।” ২০২৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে (২০৯টি), তারপরে ছত্তিশগড়ে (১৬৫টি)। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়নি বলে মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পুলিশে যাওয়ার সাহস পান না, কারণ পুলিশের ভূমিকা পক্ষপাতদুষ্ট ও অপরাধীদের পক্ষ নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ইউসিএফ আশাপ্রকাশ করেছে, আর্চবিশপ গ্যালাঘার ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলবেন এবং সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক স্তরে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

আরও পড়ুন: পুরুষ নিষিদ্ধ এই দেশে! চারিদিকে রূপসী নারীর ছড়াছড়ি, সন্তান উৎপাদন হয় কীভাবে? এ এক ইউটোপিয় দ্বীপ!

ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর প্রকাশ্য হেনস্থা, গৃহ উচ্ছেদ, মসজিদ ও গির্জার উপর হামলা, মিথ্যা ধর্মান্তর আইনে গ্রেপ্তার—এইসব আজ যেন রুটিন চিত্র হয়ে উঠেছে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলোতে ধর্মীয় উগ্রতা প্রশাসনের মদতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যেকোনও সংখ্যালঘু ধর্মীয় উৎসব বা সমাবেশকে ‘আইনশৃঙ্খলা সমস্যা’ বলে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, আবার অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী মিছিল ও গোহত্যা বিরোধী বাহিনীকে পুলিশি পাহারায় প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

এই ধর্মীয় উগ্রতা শুধু রাস্তার হিংসায় নয়, আইন ও প্রশাসন কাঠামোর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর বুলডোজ করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেন বিচারব্যবস্থার কোনও মানে নেই। মিথ্যা ধর্মান্তর মামলায় খ্রিস্টান পুরোহিতদের বা মুসলিম শিক্ষকদের বারবার টার্গেট করা হচ্ছে, তদন্তের আগেই জনতার আদালতে সাজা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে লঙ্ঘন করছে না, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিরও পরিপন্থী। একদিকে ভারত ‘বিশ্বগুরু’-র ভূমিকা দাবি করছে, অপরদিকে তার ভেতরে সংখ্যালঘুদের উপর দমনপীড়ন বিশ্বের নজর কেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপির আদর্শগত ভিত্তি হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-এর ভাবাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে, যার লক্ষ্য একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে কোণঠাসা করে তোলা হচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন, এনআরসি-র মাধ্যমে মুসলিমদের টার্গেট করা, কিংবা রাম মন্দিরের নামে রাজনৈতিক মেরুকরণ—সবই এই বৃহত্তর প্রকল্পের অঙ্গ। এই অবস্থায় সংবিধান রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, আদালত, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষ ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন। না হলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও দুর্বল হবে এবং ভারত আরও গভীর বিভাজনের দিকে এগোবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নটি শুধু মানবিক নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।