‌আবু হায়াত বিশ্বাস


দলের সঙ্গে দুরত্ব বাড়ছে শশী থারুরের। ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। কংগ্রেস ও থারুরের দুরত্বের ছবিটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে লোকসভায় দলীয় বক্তাদের তালিকায় রাখাই হলনা তিরুবনন্তপুরমের এই কংগ্রেস সাংসদকে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েকমাস ধরে থারুর ধারাবাহিকভাবে দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে মোদি সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। বিদেশের মাটিতে অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী সময়ে সরকারের গুণগান করেছেন। যা কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব ভাল চোখে দেখেনি। ফলশ্রুতি, সংসদে অপারেশন সিঁদুর আলোচনায় দলের বক্তা তালিকায় বাদ থারুর। সোমবার সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে থারুরের সংক্ষিপ্ত কিন্তু রহস্যময় জবাব ছিল,‘‌মৌনব্রত, মৌনব্রত।’‌ লোকসভায় দলের বক্তা তালিকায় যুবদের সুযোগ দেয় কংগ্রেস।

যথারীতি কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈ অপারেশন সিঁদুর নিয়ে সরব হন। তারপরে কংগ্রেস সাংসদ দীপেন্দর হুডাও বলেন। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে কংগ্রেসের বক্তা তালিকায় রয়েছেন সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, প্রণীতি শিণ্ডে, সপ্তগিরি উল্কা এবং বিজেন্দর এস ওলা। অথচ শশী থারুরকে তালিকায় রাখেইনি দল। যদিও থারুর ঘনিষ্ট সূত্রের দাবি, তিরুবনন্তপুরমের সাংসদকে অনুরোধ করা হয়েছিল পহেলগাঁও জঙ্গি হামলা এবং অপারেশন সিঁদুর নিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীপক্ষের অন্যতম মুখ হয়ে সংসদে কথা বলার জন্য। এই অনুরোধ এসেছিল সরাসরি রাহুল গান্ধীর দপ্তর থেকে। কিন্তু থারুর নাকি জানিয়ে দেন, তিনি অপারেশন সিঁদুরকে সমর্থন করেন এবং নিজের আগের বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধিতা করে শুধু দলের প্রচারের খাতিরে কিছু বলতে পারবেন না। সম্প্রতি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক প্রশ্নের জবাবে শশী থারুরকে নিয়ে বলেছিলেন,‘‌আমাদের জন্য সবার আগে দেশ। কিন্তু কারও কারও জন্য মোদিই সবার আগে।’

কংগ্রেস এবং আইএনডিআইএ জোটের অন্যান্য দলগুলি যেখানে জম্মু-কাশ্মীরের পাহালগামে সাম্প্রতিক জঙ্গি হানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগে সোচ্চার, সেখানে থারুর উল্টো সুরে কথা বলে দলের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেন। সম্প্রতি কোচিতে এক অনুষ্ঠানে থারুর বলেন, "দেশের স্বার্থ আগে। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মঙ্গল করার জন্যই থাকা উচিত।" তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনী ও কেন্দ্র সরকারকে কিছু বিষয়ে সমর্থন করায় তাঁকে অনেকেই "দলবিরোধী" বলছেন, কিন্তু তিনি নিজের অবস্থানে অটল থাকবেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, "যখন কেউ জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য দলের সঙ্গে সহযোগিতার ডাক দেন, তখন তাঁর নিজের দলই তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। এটাই বড় সমস্যা।" কে মুরলীধরন অতীতে থারুরকে নিয়ে একাধিকবার কটাক্ষ করেছিলেন। সম্প্রতি এক জরিপে থারুরকে ইউডিএফ-এর মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হলে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, "প্রথমে ওঁর ঠিক করা উচিত, উনি কোন দলে আছেন।" এছাড়া, থারুর যখন মালয়ালম সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন, তখনও মুরলীধরন তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানান এবং বলেন, একজন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে থারুরের এই ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এই মুহূর্তে থারুরের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব ঘনীভূত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেরলের রাজনীতিতে আগামীদিনে এই মতানৈক্য বড় ধরনের বিভাজনের ইঙ্গিত দিতে পারে। একদিকে থারুর জাতীয় স্তরে নিজেকে ‘নির্বাচযোগ্য মুখ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, অন্যদিকে রাজ্য কংগ্রেস তাঁর এই "স্বতন্ত্র রাজনীতি"কে সহ্য করতে পারছে না। এখন দেখার, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয় — শশী থারুরকে ফের দলে সম্পৃক্ত করতে চায়, না কি তাঁকে আলাদা পথে যেতে উৎসাহিত করে। যে কোনো সিদ্ধান্তই কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কেরল রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।