আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিরক্ষা ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে। সেটি হল ফরাসি প্রযুক্তির ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান। এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং সামরিক আধুনিকায়নের নতুন অধ্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। 


ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ আলোচনার পর ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক যুদ্ধবিমান ক্রয় প্রকল্প। এই সিদ্ধান্ত পূর্ব লাদাখ ও ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে চলা নিরাপত্তা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মত।


রাফাল একটি বহুমুখী জেনারেশনের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, যা ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশন তৈরি করে। ২০২০ সালে ভারত প্রথম ধাপে ফ্রান্স থেকে ৩৬টি রাফাল সংগ্রহ করেছিল এবং সেগুলো ইতিমধ্যে ভারতীয় বায়ুসেনার পশ্চিম ও পূর্ব সেক্টরে মোতায়েন রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরও ১১৪টি রাফাল বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন শক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। ভারতের বর্তমান ফাইটার স্কোয়াড্রন সংখ্যা প্রয়োজনীয় মানের তুলনায় কম, তাই এই অধিগ্রহণ ভবিষ্যৎ মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।


বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, রাফাল যুদ্ধবিমান উচ্চগতির ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ মিসাইল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, ভয়ঙ্কর আঘাতক্ষম ‘স্কালপ’ ও ‘মিটিওর’ মিসাইল এবং উন্নত অ্যাভিওনিক্স প্রযুক্তিতে সজ্জিত। এগুলো ভারতীয় বায়ুসেনাকে চীনের জে-২০ বা পাকিস্তানের এফ-১৬ ও জেএফ-১৭ এর বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা দেবে।


এই ১১৪টি রাফাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহৎ অংশ দেশেই অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং হবে, যা দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে উত্সাহিত করবে। এতে উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি, দেশে কাজের সুযোগ এবং প্রতিরক্ষা খাতে ‘এয়ারোস্পেস ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠবে।


রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতের এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক আধুনিকায়ন নয়, বরং কৌশলগত বার্তাও বহন করে। চীন ভারত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, পাকিস্তান চীনা যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করছে—এর মাঝে ভারতের বিমান শক্তি সুদৃঢ় করা জরুরি ছিল। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিরক্ষা ক্ষমতা শক্তিশালী করাও বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।


রাফাল প্রকল্প শুধু প্রতিরক্ষা নয়, কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স দীর্ঘদিন ভারতের কৌশলগত অংশীদার, পারমাণবিক, স্যাটেলাইট, সাইবার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দু’দেশের সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এই লেনদেন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্ত করবে।

 


মোট ১১৪টি রাফাল ক্রয়ের অনুমোদন ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটি আকাশে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করবে, উন্নত প্রযুক্তি দেশে আনবে, প্রতিরক্ষা শিল্পকে গতি দেবে এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত করবে। ভবিষ্যতে মেক ইন ইন্ডিয়া যুদ্ধবিমান প্রকল্পের পাশাপাশি রাফাল মোতায়েন ভারতের সামরিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।