মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবার! বৃদ্ধকে ফের জোয়ান বানালেন বিজ্ঞানীরা, কোথায় হচ্ছে এই চিকিৎসা? খরচাই বা কত?
- 1
- 10
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের এক শান্ত গবেষণাগারে এমন কিছু ঘটছে, যা বহুদিন ধরে কেবল কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেখানে বৃদ্ধ ইঁদুরেরা আবার তরুণ হয়ে উঠছে। ঝাপসা দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে, ক্ষয়প্রাপ্ত স্নায়ু নতুন করে কাজ শুরু করছে, এমনকি বয়সজনিত দুর্বলতাও যেন ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাচ্ছে। এই গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন মলিকিউলার জীববিজ্ঞানী ডেভিড সিনক্লেয়ার যিনি গত দুই দশক ধরে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন: বার্ধক্য কি সত্যিই অনিবার্য?
- 2
- 10
২০২০ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত সিনক্লেয়ারের দলের এক গবেষণা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। বয়সের ভারে প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া ইঁদুরদের চোখে বিশেষ কিছু প্রোটিন প্রয়োগের পর দেখা যায়, তাদের রেটিনা আবার কাজ করতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিশক্তি তরুণ ইঁদুরদের সমান, এমনকি কখনও কখনও আরও ভালো। সিনক্লেয়ারের ভাষায়, এটি কোনো সাময়িক উন্নতি নয়, বরং কোষের বয়সকে কার্যত ‘রিসেট’ করে দেওয়া।
- 3
- 10
লাইফ ইটসেলফ নামের এক আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিনক্লেয়ার বলেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ক্যানসার, হৃদরোগ বা আলঝাইমারের মতো রোগের চিকিৎসা করে ঠিকই, কিন্তু রোগের মূল কারণকে ছুঁতে পারে না। তার মতে, সেই মূল কারণ একটাই বার্ধক্য। যদি বয়স বাড়ার জৈবিক প্রক্রিয়াকে ধীর করা বা উল্টে দেওয়া যায়, তাহলে এই রোগগুলোরই আর জন্ম হবে না। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, এমন এক ভবিষ্যৎ আসছে, যেখানে মানুষ শতবর্ষ পার করবে ৭০-এ ক্যানসার, ৮০-এ হৃদরোগ বা ৯০-এ স্মৃতিভ্রংশের ভয় ছাড়াই। প্রশ্ন শুধু কবে।
- 4
- 10
এই গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে। ২০০৭ সালে জাপানের বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা দেখান, মাত্র চারটি প্রোটিন ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ত্বকের কোষকে আবার স্টেম সেলে রূপান্তর করা সম্ভব। এই আবিষ্কার নোবেল পুরস্কার পায় এবং ওই প্রোটিনগুলো ‘ইয়ামানাকা ফ্যাক্টর’ নামে পরিচিত হয়। তবে সমস্যা ছিল, একেবারে স্টেম সেলে ফিরে গেলে কোষ তার পরিচয় হারিয়ে ফেলে। হৃদপিণ্ডের কোষ আর জানে না সে হৃদপিণ্ডের, স্নায়ুকোষ আর জানে না সে স্নায়ুকোষ।
- 5
- 10
সিনক্লেয়ারের ভাষায়, “আমরা চাই না মানুষ হঠাৎ শিশু হয়ে যাক। আমরা চাই বয়স পিছিয়ে যাক, কিন্তু মানুষ যেন মানুষই থাকে।” এই লক্ষ্যেই তার ল্যাব ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করে। আগের কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, সীমিত সময়ের জন্য এই প্রোটিনগুলো প্রয়োগ করলে বয়সের চিহ্ন মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তাতে ক্যানসারের ঝুঁকিও দেখা দিচ্ছিল।
- 6
- 10
এই ঝুঁকি কমাতে সিনক্লেয়ারের ল্যাবে গবেষক ইউয়ানচেং লু চারটির বদলে তিনটি প্রোটিন বেছে নেন। সেগুলো একটি ক্ষতিকর নয় এমন ভাইরাসের মাধ্যমে বৃদ্ধ ইঁদুরের চোখে প্রবেশ করানো হয়। পরে একটি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ওই জিনগুলো চালু করা হয়। ফল ছিল চমকপ্রদ। ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুকোষ আবার নতুন করে অ্যাক্সন তৈরি করে, চোখ থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠানো শুরু হয়। বয়স যেন সত্যিই পিছিয়ে যায়।
- 7
- 10
এই সাফল্যের পর সিনক্লেয়ারের দল ইঁদুরের পেশি ও মস্তিষ্কেও একই ধরনের পুনরুজ্জীবনের প্রমাণ পেয়েছে। এখন তারা পুরো শরীরের বয়স একসঙ্গে উল্টে দেওয়ার দিকেও এগোচ্ছে। সিনক্লেয়ার মনে করেন, শরীরের ভেতরেই তারুণ্যের এক ধরনের ‘ব্যাকআপ কপি’ সংরক্ষিত থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষ জিনগত তথ্য হারায় না, বরং সেই তথ্য পড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তিনি একে বলেন “বার্ধক্যের তথ্যতত্ত্ব”যেখানে বয়স আসলে তথ্য হারানোর ফল।
- 8
- 10
মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে এখনও বহু বছর লাগবে। নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সব দিক খতিয়ে দেখতে হবে। তবু সিনক্লেয়ার আশাবাদী। তার মতে, ইঁদুরে যদি সম্ভব হয়, মানুষের ক্ষেত্রে অসম্ভব হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এই বৈপ্লাবিক চিকিৎসা আসা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য সিনক্লেয়ারের পরামর্শ তুলনামূলকভাবে সহজ। উদ্ভিদভিত্তিক খাবার, কম ঘন ঘন খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ কমানো এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, এসবই আমাদের এপিজেনোমকে প্রভাবিত করে, যা ঠিক করে দেয় কোন জিন কখন সক্রিয় হবে।
- 9
- 10
নিজের জীবনে সিনক্লেয়ার দিনে মাত্র একবার খাবার খান। তার দাবি, এতে তার জৈবিক বয়স উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে ৫৩ বছরের শরীরে তার জৈবিক বয়স এখন ৪২। তিনি নিয়মিত হাঁটেন, ব্যায়াম করেন, গরম সোনা ও ঠান্ডা জলে স্নান করেন এবং কিছু নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এর অনেক কিছুর দীর্ঘমেয়াদি ফল এখনও পুরোপুরি জানা নেই।
- 10
- 10
