আজকাল ওয়েবডেস্ক: আধুনিক যুদ্ধবিমান বা ফাইটার জেট নিয়ে ভাবলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুপারসনিক গতি, মহাকাশযানের মতো ককপিট বা উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা। কিন্তু এর মধ্যেই এমন এক প্রযুক্তি আছে, যার দাম শুনলে অনেকেই অবাক হন — ফাইটার জেট পাইলটদের বিশেষ হেলমেট। এই হেলমেটগুলোর দাম অনেক সময় একটি বিলাসবহুল গাড়ির থেকেও বেশি, প্রায় কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত। কেন এই দাম এত বেশি? এর পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, এবং যুদ্ধক্ষেত্রের জটিলতা।


প্রথমত, এই হেলমেটগুলো সাধারণ প্রটেকটিভ গিয়ার নয়, বরং পাইলটের মাথায় মাউন্ট করা এক ধরনের “মিনি কমান্ড সিস্টেম”। অতি আধুনিক জেটে ব্যবহৃত হেলমেটগুলোতে থাকে অ্যাভিওনিক্স লিঙ্ক, নাইট ভিশন, থার্মাল ইমেজিং, টার্গেট ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং পাইলটের চোখের গতি শনাক্তকারী সেন্সর। পাইলট যখন শুধুমাত্র মাথা ঘোরায় বা কোনও দিকে তাকায়, জেটের অস্ত্র ও সেন্সর সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করে — যেন চোখ-চালিত যুদ্ধব্যবস্থা। এই সিস্টেমগুলো তৈরি করতে উচ্চমানের সেন্সর, সফটওয়্যার এবং মিলিটারি গ্রেড অপটিক্স লাগে, যা বাজারে অবাধে পাওয়া যায় না এবং দামে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।


দ্বিতীয়ত, প্রতিটি হেলমেট পাইলটের মাথা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা হয়। যুদ্ধবিমানে কয়েক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্তও জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করতে পারে, তাই হেলমেটের ফিটিং, ওজন, ভারসাম্য এবং দৃশ্যমানতা পাইলটের সাথে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্য করা অপরিহার্য। এজন্য মাথার থ্রিডি স্ক্যানিং, বিশেষ উপাদান, শক-রেজিস্ট্যান্স টেস্ট এবং ব্যক্তিগত ক্যালিব্রেশনই আলাদা খরচ তৈরি করে।


তৃতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হেলমেটগুলোকে উচ্চগতির ইজেকশন বা জি-ফোর্সে শরীরের ওপর চাপ সহ্য করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি পাইলট যদি জরুরি মুহূর্তে ককপিট থেকে ইজেক্ট হয়, তখন হেলমেটটিই মাথা রক্ষা করবে এবং সেন্সরের মাধ্যমে প্যারাসুট সিস্টেমের তথ্যও দেবে। এসব কারণে হেলমেটগুলো কঠোর সামরিক টেস্টিং, শক-অ্যাবসরবিং ডিজাইন ও অগ্নি-সহনশীল উপাদানে তৈরি হয়। এই পরীক্ষাগুলোর প্রতিটিই ব্যয়বহুল এবং বহু বছরের গবেষণা দরকার।


চতুর্থত, এই প্রযুক্তিগুলোর বেশিরভাগই “মিলিটারি-গ্রেড” এবং সাধারণ বাজারে উৎপাদন বা বিক্রি হয় না। উৎপাদন সীমিত হওয়ায় প্রতি ইউনিট খরচ বাড়ে। তুলনায় বিলাসবহুল গাড়ি লক্ষ লক্ষ ইউনিটে তৈরি হয়, ফলে স্কেল-ইকনমি কাজ করে এবং দাম কমে আসে। ফাইটার হেলমেট বছরে কয়েকশ বা কয়েক ডজনের বেশি তৈরি হয় না, যার ফলে এর উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটেই বিশাল থাকে।


এগুলো শুধু পাইলটের মাথা রক্ষা করে না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রকে মাথার ভেতর এনে দেয় — শত্রু বিমান কোথায়, মিসাইল লক হয়েছে কিনা, ভূমির নির্দেশাবলি, নেভিগেশন ডেটা—সব একসাথে। এই প্রযুক্তি তৈরিতে বহু বছর গবেষণা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট লাগে।


তাই যখন শুনি একটি হেলমেটের দাম ৩–৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে সেটা আসলে যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা ও প্রযুক্তির প্রতিফলন। এখানে বিলাসিতা নয়—গতি, নিরাপত্তা, তথ্য ও নির্ভুলতার ওপর ভিত্তি করেই মূল্য নির্ধারিত হয়।