আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত তিন বছর ধরে জ্বলতে থাকা মণিপুর আবারও অশান্তির আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। শান্তি ফেরার যেটুকু আশা তৈরি হয়েছিল, গত ৭ এপ্রিল বিষ্ণুপুর জেলার ট্রংলাওবি গ্রামে দুই নিস্পাপ শিশুর মৃত্যু সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। কুকি জঙ্গিদের ছোড়া বলে সন্দেহ করা একটি মর্টার বা প্রজেক্টাইল সরাসরি আছড়ে পড়ে এক সাধারণ গ্রামবাসীর বাড়ির ওপর। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পাঁচ বছর ও পাঁচ মাস বয়সী দুই শিশুর। গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তাদের মা। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা রাজ্য।
শিশুমৃত্যুর প্রতিবাদে রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর পালটা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ৮ এপ্রিল সিআরপিএফ ক্যাম্পে হামলার চেষ্টাকালে বাহিনীর গুলিতে তিন প্রতিবাদীর মৃত্যু হয়, আহত হন অন্তত ৩০ জন। ক্ষোভের এই দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ইম্ফল পশ্চিম এবং বিষ্ণুপুরের অন্যান্য এলাকায়। গত ১৪ এপ্রিল নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আরও ১৮ জন আহত হন। এমনকি গত শনিবার ইম্ফল পশ্চিমে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী স্মোক বোম ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করলে আরও পাঁচজন জখম হন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচার করে বিষ্ণুপুর, থৌবাল, কাচিং এবং ইম্ফল পূর্ব ও পশ্চিমের মতো পাঁচটি জেলায় ইন্টারনেট পরিষেবা ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৮ এপ্রিল উখরুল জেলায় ফের বন্দুকবাজদের অতর্কিত হামলায় দুই নাগা ব্যক্তির মৃত্যু উত্তেজনাকে শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। মৃতদের মধ্যে একজন নাগা রেজিমেন্টের প্রাক্তন সেনাও রয়েছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হল, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামাতে যখন মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং উখরুলে শান্তি বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন, ঠিক তখনই জাতীয় সড়কের ওপর সাধারণ মানুষের গাড়িতে এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটল। এই ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, শান্তি আলোচনা বা সরকারি হস্তক্ষেপের বাস্তব কোনও প্রভাব আপাতত মণিপুরের মাটিতে পড়ছে না। মেতেই মহিলাদের সামাজিক সংগঠন 'মৈরা পাইবি' এই ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার (১৯ এপ্রিল) থেকে টানা সাত দিনের রাজ্যজুড়ে বনধের ডাক দিয়েছে। মণিপুরের এই উত্তাপের আঁচ পৌঁছেছে প্রতিবেশী রাজ্য মেঘালয় এবং অসমেও। শিলং এবং কাছাড় জেলায় মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ মোমবাতি মিছিল ও নীরব অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের এই মর্মান্তিক হত্যার বিচার চেয়েছেন।
এদিকে মণিপুরের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বাগযুদ্ধ। কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে ১৯ এপ্রিল এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। মণিপুরের জ্বলন্ত পরিস্থিতির দিকে আঙুল তুলে তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী দেশকে বিভাজনের চেষ্টা না করে আগে মণিপুরকে রক্ষা করুন।" শ্রীনাতে অভিযোগ করেন যে, তিন বছর ধরে মণিপুর পুড়ছে, অথচ প্রধানমন্ত্রী তিন ঘন্টার জন্যও সেখানে যাওয়ার সময় পাননি। যেখানে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী মানুষের চোখের জল মুছতে মণিপুরে পৌঁছে যাচ্ছেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, রাজ্যের হাজার হাজার নারী ও শিশু এখনও ত্রাণ শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, আর সরকার তথাকথিত উন্নয়নের ডঙ্কা বাজাচ্ছে। বিজেপি সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়োগও মণিপুরে শান্তি ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। বর্তমানে থমথমে মণিপুর এখন কার্যত এক বিচারহীনতার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে।















