আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে চলা এক চরম টানাপোড়েনের পর অবশেষে আইনি জয় এসেছে। নিউজক্লিক (NewsClick) পোর্টাল এবং এর প্রধান সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের মামলা খারিজ করে দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। বিচারপতি নীনা বনশল কৃষ্ণের এজলাস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, এই মামলা চালানো আসলে ‘আইনি প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার’ এবং দেশের ‘মুক্ত ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর এক স্বেচ্ছাচারী আঘাত’। আদালতের এই রায়কে প্রেস ফ্রিডম বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এক বড় জয় হিসেবে দেখছেন অনেকেই।

কিন্তু আদালতের রায় কি কাগজের পাতা থেকে বেরিয়ে বাস্তব জীবনের ক্ষতগুলো নিমেষে সারিয়ে দিতে পারে? উত্তরটা হল— না। যে সাংবাদিক, ভিডিও এডিটর, গবেষক এবং প্রশাসনিক কর্মীরা মাসের পর মাস রক্ত জল করে এই সংস্থাকে সচল রেখেছিলেন, তাঁদের জীবনের অন্ধকার এখনও কাটেনি। আইনি লড়াইয়ে সংস্থা জিতলেও, কর্মীদের অস্তিত্বের লড়াই এখনও চলছে প্রতিদিন।

আদালত নিউজক্লিক-কে ক্লিনচিট দিলেও, কর্পোরেট মিডিয়া ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর মানসিকতায় এক অদৃশ্য ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকা তৈরি হয়ে রয়েছে। কোনও কোনও  প্রাক্তন কর্মী জানাচ্ছেন, বড় মিডিয়া হাউস বা কর্পোরেট জনসংযোগ সংস্থাগুলোতে ইন্টারভিউ দিতে গেলে তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠছে না। কিন্তু যেই মুহূর্তে সিভি-তে ‘নিউজক্লিক’ নামটা দেখা যাচ্ছে, ওখানেই কথা থমকে যাচ্ছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ভয় পাচ্ছে, এই কর্মীদের চাকরি দিলে যদি সরকারের বা আয়কর দপ্তরের নজর তাদের ওপর পড়ে! আইনিভাবে মামলা খারিজ হওয়ার পরেও এই কর্মহীনতার অপবাদ ও অনিশ্চয়তা যেন এক অদৃশ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের ক্যারিয়ারের সামনে।

২০২৩ সালের শেষের দিকে যখন নিউজক্লিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলো সম্পূর্ণ ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন ২০২৪-এর শুরুতে বাধ্য হয়েই সিংহভাগ কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয় সংস্থাকে। গত দুই বছর ধরে এই সাংবাদিক ও কর্মীরা তাঁদের জমানো সামান্য পুঁজি ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ কেউ নামমাত্র টাকায় ছোটখাটো ফ্রিল্যান্স কাজ করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সাংবাদিকতার জগৎই ছেড়ে দিয়েছেন টিকে থাকার লড়াইয়ে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছিল প্রযুক্তিগত জায়গায়। ২০২৩ সালের অভিযানের সময় দিল্লি পুলিশ প্রায় ৮০ জন সাংবাদিক ও কর্মীর ল্যাপটপ, হার্ড ড্রাইভ এবং মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছিল। একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাছে তাঁর ল্যাপটপ আর ফোনই হল বেঁচে থাকার প্রধান অস্ত্র, তাঁর কাজের পোর্টফোলিও। মাসের পর মাস সেই ডিজিটাল ডিভাইসগুলো আটকে রাখায়, অন্য কোথাও কাজের আবেদন করার ন্যূনতম সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

এই পুরো ঘটনাটি আধুনিক ভারতের স্বাধীন সাংবাদিকতার এক বিপজ্জনক প্রবণতাকে সামনে এনেছে— যেখানে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার অনেক আগেই ‘আইনি প্রক্রিয়া’-কে শাস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর্থিক অক্সিজেন বন্ধ করে দেওয়া, পরিকাঠামো কেড়ে নেওয়া এবং সামাজিক বয়কটের আবহ তৈরি করে একটি স্বাধীন সংবাদ সংস্থাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার এই যে ছক, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কর্মীদের।

দিল্লি হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় নিউজক্লিকের গায়ে লেগে থাকা দাগ ধুয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে তরুণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা এই ব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষে গেলেন, তাঁদের হারিয়ে যাওয়া দিন, মানসিক ট্রমা এবং রুটিরুজি ফিরে পাওয়ার লড়াইটা আইনি আদালতের বাইরে, অনেক বেশি কঠিন ও দীর্ঘ।