আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেরলের বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) সরকারের পরিবহণমন্ত্রী কে গণেশ কুমারকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর স্ত্রীর গুরুতর অভিযোগের জেরে। রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন পরিস্থিতি সামাল দিতে গণেশ কুমারকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গণেশ কুমারের স্ত্রী বিন্দু মেনন প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে পরকীয়া ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সম্প্রতি তিনি স্বামীকে তাঁদের বাড়ির শোবার ঘরে অন্য এক মহিলার সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান।

বিন্দু মেননের বক্তব্য, ঘটনার সময় তিনি মোবাইলে ছবি তুলতে শুরু করলে মন্ত্রীর কর্মীরা তাঁর ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, “আমি আবেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম, কিন্তু কাউকে আঘাত করিনি বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করিনি।” তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, ঘটনার পরে পুলিশকে জানালেও তারা বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হয়নি। বিন্দু মেননের দাবি, তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা সরকারকে বিপদে ফেলতে চান না; কিন্তু ঘটনাটি তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

বিতর্ককে আরও জটিল করেছে আরেকটি দাবি। বিন্দু মেননের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের মেয়ে বীণা বিজয়নকে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানান। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত বিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক আলোচনাতেও উঠে এসেছে।৬০ বছর বয়সী গণেশ কুমার কেরলের পাথানাপুরম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে টানা পাঁচবার নির্বাচিত বিধায়ক। তিনি কেরল কংগ্রেস (বি) দলের চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে এলডিএফ সরকারের একমাত্র ওই দলের প্রতিনিধি।

এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর বাবা, প্রয়াত আর বালাকৃষ্ণ পিল্লাই যিনি দীর্ঘদিন কেরলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং রাজ্য মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একসময় United Democratic Front (UDF) জোটে থাকা  কেরল কংগ্রেস (বি) পরে এলডিএফে যোগ দেয় এবং গণেশ কুমার মন্ত্রিসভায় স্থান পান।

এই ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি পুরনো বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। ২০১৩ সালে ওম্মেন চান্ডি নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ সরকারের সময় গণেশ কুমারকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল। তখন তাঁর প্রথম স্ত্রী যামিনী থানকাচি তাঁকে শারীরিক নির্যাতন ও পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন।
সেই সময় গণেশ কুমার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলছে এবং তাঁকে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে।

বর্তমান অভিযোগ প্রসঙ্গে গণেশ কুমার বলেছেন, বিরোধীরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “অভিযোগ সত্যি হোক বা মিথ্যা—এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। অন্য কারও এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। প্রেম অপরাধ নয়। প্রত্যেক মানুষই জীবনে প্রেম অনুভব করে।” তিনি আরও দাবি করেন, তিনি কখনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষ এই ধরনের অভিযোগ বিশ্বাস করবেন না।

এই ঘটনাকে ঘিরে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন United Democratic Front (UDF) ইতিমধ্যেই সরকারকে তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ভি ডি সাথিশান বলেন,“একজন মন্ত্রীর স্ত্রী যদি ন্যায়বিচার না পান, তাহলে কেরলের সাধারণ মহিলারা কীভাবে ন্যায়বিচার পাবেন?” তিনি মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারকেও কটাক্ষ করে বলেন, এগুলো শুধু জনসংযোগমূলক প্রচার ছাড়া কিছু নয়।

অন্যদিকে সিপিআই(এম) নেতা এম এ বেবি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে কেরলের দলীয় নেতৃত্ব যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। কেরলে বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময় এই বিতর্ক এলডিএফ সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিরোধীরা এই ইস্যুকে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এখন নজর মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের সিদ্ধান্তের দিকে—তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে গণেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে বলবেন কি না, সেটাই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন।