আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিষাক্ত পানীয় জল খেয়েই মৃত্যুমিছিল। মৃতদের তালিকায় রয়েছে সদ্যোজাত শিশুও। হাজারের বেশি বাসিন্দা অসুস্থ এখনও। বহু মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে হাহাকার মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের ভাগীরথপুরায়। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরের ভাগীরথপুরা এলাকায় পানীয় জলে নিকাশির জল মিশে গিয়ে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত এই ঘটনায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ছয় মাসের এক শিশু ও ছয়জন মহিলা রয়েছেন।
সর্বভারতীয় সংবাদসংস্থা সূত্রে খবর, গবেষণাগারের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, মৃত্যুমিছিল বিষাক্ত জলের কারণেই। তথ্য, জল সরবরাহের পাইপ লাইন ফেটে যাওয়ার কারণেই, সেখান থেকে বিষাক্ত জল ছড়িয়ে পড়ে পানীয় জল হিসেবে। তা থেকেই ভয়াবহ পরিস্থিতি। মৃত্যুমিছিল। একে একে সামনে আসছে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের শিউরে ওঠা বয়ান। ইন্দোরে মৃত শ্রমিকের ভাই, অনিল লিখর জানিয়েছেন, কাজ থেকে বাড়িতে ফেরার পর থেকেই, ওই ব্যক্তি ক্রমাগত বমি করছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তখনও বুঝতেই পারেননি, কোন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, ভাইয়ের মৃত্যুর আগের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে লিখার বলেন, 'রবিবার, দাদা কাজ থেকে বাড়ি ফিরে বারবার বমি করতে থাকে। বুধবার সন্ধ্যায়, আমি আমার দোকানে গিয়েছিলাম এবং একটি বাড়ি থেকে ফোন পাই যে, দাদার শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। আমরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর।'
সূত্রের তথ্য, জল দূষণ এবং মৃত্যুর সমালোচনার মধ্যে রাজ্য সরকার জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সরকার সকল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করবে। জল দূষণের কারণগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হবে," সংবাদ সংস্থা এএনআই শুক্লাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে দূষিত জল পান করার পর একই রকম লক্ষণ দেখা দিলে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যম সূত্রে তথ্য, বিষয়টি তদন্তের জন্য আইএএস অফিসার নবজীবন পানওয়ারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ইন্দোরের ভাগীরথপুরা এলাকায় দূষিত জল পান করে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। তালিকায় এক খুদেও। আভিযান। তার বাবা সুনীল সাহু একটি বেসরকারি কুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ করেন। বছরের পর বছর প্রার্থনা ও অপেক্ষার পর ৮ই জুলাই তিনি পুত্রসন্তানের বাবা হন। তাঁদের মেয়ে কিঞ্জলেরবয়স সাড়ে দশ বছর।
শিশুটা সুস্থ ছিল। কোনও অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু দুই দিন আগে আভিয়ানের জ্বর ও ডায়রিয়া হয়। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওষুধ দেওয়া হয়, কিন্তু তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। রবিবার রাতের মধ্যে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সোমবার সকালে হাসপাতালে যাওয়ার পথেই আভিয়ান মারা যায়।
পরিবারটি বিশ্বাস করে যে পাঁচ মাসের শিশুর শারীরির অসুস্থতা হয়ে ছিল বিষাক্ত জল থেকেই।
সুনীল বলেন, জল যে দূষিত, তা তাঁদের কেউ জানায়নি। তাঁরা জল ছেঁকে নিত, ফিটকিরি মেশাত এবং সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করত। পুরো পাড়ার মানুষ একই জল ব্যবহার করত। কোনও সতর্কতা জারি করা হয়নি। কোনও পরামর্শও দেওয়া হয়নি।
সুনীল বলেন, "আমার বিশ্বাস, আমরা দুধে যে জল মিশিয়েছিলাম, সেটাই ওর ক্ষতি করেছে। আমার স্ত্রীর দুধ তৈরি হত না, তাই আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যাকেটের দুধে জল মেশাতাম। আমরা নর্মদার কলের জল ব্যবহার করতাম। আমরা কখনও কল্পনাও করিনি যে এটা এত দূষিত হতে পারে। ওর দুই দিন ধরে ডায়রিয়া ছিল। আমরা ওকে ওষুধ দিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎই ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে এখানকার লোকেরা আমাদের আসল সত্যিটা বলেছে।"
মৃত ঠাকুমা নরম সুরে বলেন, "আমরা গরিব। আমাদের ছেলে একটা বেসরকারি চাকরি করে। তা দিয়েই সংসার চলে। আমরা কাউকে দোষ দিতে পারি না। ঈশ্বর আমাদের সুখ দিয়েছিলেন... আর তারপর তা কেড়ে নিলেন।" ঘরের ভিতরে শিশুটির মা জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং ফিরে পাচ্ছেন। দশ বছর বয়সী কিঞ্জল চুপচাপ বসে আছে, যেন সে বুঝতে পারছে যে এমন কিছু হয়েছে যা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
