আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ। বন্ধ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের কাছে পৌঁছচ্ছে না জ্বালানি। বিপাকে ভারতও। সমস্যা সমাধানের জন্য ভারত এখন এলপিজি নিচ্ছে আর্জেন্টিনা ও আমেরিকার কাছ থেকে। 

ভারতের প্রতি বছর যে জ্বালানি খরচ হয় তার ৬০ শতাংশের বেশি আসে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী হয়ে। আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরানের সংঘর্ষের ফলে বন্ধ সেই প্রণালী। ফলে ভারতের তেল ও জ্বালানি এবার তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। এই সমস্যার সমাধান করতে ভারত এখন আর্জেন্টিনা ও আমেরিকার থেকে এলপিজি নিচ্ছে।  

চলতি বছরের শুরুর তিন মাসের মধ্যেই আর্জান্টিনা প্রায় ৫০,০০০ টন এলপিজি ভারতে পাঠিয়েছে। গত বছরে আর্জেন্টিনা সারা বছরে মোট এলপিজি পাঠিয়েছিল মোট ২২,০০০ টন। এ বছরের শুরুতেই সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগেই আর্জেন্তিনা থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে ৩৯,০০০ টন এলপিজি রওনা হয়। আর মার্চের ৫ তারিখের পরে আরও ১১,০০০ টন। 

উল্লেখ্য, ২০২৪ এর আগে ভারত আর্জেন্টিনার কাছ থেকে জ্বালানি নিত না। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ভারত আমেরিকার কাছ থেকেও জ্বালানি নিচ্ছে। চলতি বছরেই আমেরিকার থেকে ভারত প্রায় ২.২ মিলিয়ন টন জ্বালানি কিনেছে। 

সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের এই বহু দেশের থেকে তেল নেওয়ার কৌশল অনেক খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে। আগে এ দেশের সিংহভাগ জ্বালানি আসত পশ্চিম এশিয়ার থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে। এই প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে ভারতে এলপিজি সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বন্ধ হয়েছে একের পর এক রেস্তোরাঁ। জ্বালানি আমদানিতে এখন আর ভারত কোনও একটি দেশের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে আপতকালীন সময়ে আর সমস্যায় পড়তে হবে না বলেই মনে করে দিল্লি। 

তবে, সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আর্জেন্টিনা ভারত থেকে প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার দূর। এতখানি রাস্তা আসতে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি দূরত্ব বেশি বলে খরচও বাড়ছে। ফলে এলপিজি-র দাম তুলনামূলকভাবে বেড়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতের চাহিদা অনুযায়ী আর্জেন্টিনা জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। 

যেহেতু আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল থেকে আমদানি করলেও জ্বালানি সমস্যার সমাধান পুরোপুরি সম্ভবপর নয়, তাই বিকল্প ভাবছে সরকার। মানুষকে পিএনজি জ্বালানি ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করছে কেন্দ্র। যেসমস্ত এলাকায় এই নলবাহী জ্বালানি গ্যাসের ব্যবস্থা আছে, সেখানকার বাসিন্দাদের আগামী তিন আসের মধ্যে এলপিজি থেকে পিএনজিতে পরিবর্তন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তাঁদের এলপিজি সরবরাহ বন্ধ করা হবে। 

সরকারের দাবি, এর ফলে মজুত জ্বালানি সঠিক জায়গায় সরবরাহ করা সম্ভব। দেশের জ্বালানি সংকট কমবে অনেকখানি। পাশাপাশি ভারত নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়িয়েছে। এবং বাণিজ্যিক জ্বালানি সরবরাহ অনেকখানি কমিয়ে এনেছে। এবং জনসাধারণকে সতর্ক করা হচ্ছে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত এলপিজি বুক না করেন তাঁরা। 

আর্জেন্টিনার থেকে ভারতে জ্বালানি আনলে খরচ বেশি হচ্ছে। ফলে ভারত চেষ্টা করছে নিজের থেকে যতটা সম্ভব জ্বালানি উৎপাদন করা। তবে আর্জেন্টিনা ভারতকে আপৎকালীন জ্বালানি দেবে বলে আস্বস্ত করেছে। নিজেদের কাছে রান্নার তেল ও ব্যবহারিক তেলের পাশাপাশি জ্বালানিও রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত আছে। তাই রপ্তানি করতে রাজি হয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু ভারত শুধু একটি মাত্র দেশের উপরে জ্বালানি ঘিরে নির্ভর্শীল নয়। চেষ্টা চলছে ৪০টি আরও অন্যান্য দেশের থেকে জ্বালানি কেনার। 

ভারতে প্রায় সিংহভাগ জ্বালানি পশ্চিম এশিয়া থেকে আসত কারণ দূরত্ব কম। ফলে তাড়াতাড়ি ঘরে তেল আসত এবং খরচও কম হত। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে আমেরিকার সঙ্গে জ্বালানি আমদানির চুক্তি হয়। প্রায় ২.২ মিলিয়ন টন জ্বালানি আমদানির চুক্তি। কিন্তু আমেরিকা থেকে আসতে সময় লাগে প্রায় এক মাস মতো। ফলে খরচ বাড়ছে। কিন্তু ভৌগলিক রাজনীতিতে আশঙ্কা কমছে। আবার আর্জেন্টিনার থেকে জ্বালানি আমদানির দিক থেকেও একই ঘটনা। খরচ বেশি, সময় বেশি কিন্তু ভৌগলিক রাজনীতিতে সুরক্ষা তুলনমূলকভাবে বেশি। 

এই বদল সাময়িক বলে মনে হলেও ভবিষ্যৎ-এ এই বদল বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বহু বছর ধরে দেশের জ্বালানি আসত মূলত একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বদলে দিল সেই বহু বছরের চলতে থাকা ঘটনাকে। ২০,০০০ কিলোমিটার দূর থেকে জ্বালানি আনা হয়ত খরচ সাপেক্ষ কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায়, ঘরে জ্বালানি পৌঁছে যাবে।