আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের রাজনৈতিক বৃত্তে নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির একাধিপত্য নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখনই অবধারিতভাবে উঠে আসে বিরোধী শিবিরের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামচন্দ্র গুহর সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধ এই বিতর্ককে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। গুহর স্পষ্ট বক্তব্য—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করার পেছনে পরোক্ষভাবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে গান্ধী পরিবার।
কোনও রাখঢাক না রেখেই গুহ দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দল আজ স্রেফ একটি ‘পারিবারিক সংস্থা’ বা ফ্যামিলি ফার্মে পরিণত হয়েছে। তথ্যের খাতিরে তিনি তুলে ধরেছেন এক নির্মম পরিসংখ্যান। ২০০৮ সালে রাহুল গান্ধী যখন দলের নীতিনির্ধারণী স্তরে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন, তারপর থেকে দেশজুড়ে কংগ্রেসের বিধায়কের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ১,২০৪ থেকে কমে সেই সংখ্যাটা এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭৬-এ। কর্ণাটক বা কেরলের মতো কিছু রাজ্য বাদ দিলে দেশের একটা বিশাল অংশে কংগ্রেস আজ প্রায় সাইনবোর্ডে পরিণত। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ বা হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ক্ষমতাও তারা হারিয়ে ফেলেছে।
ব্যক্তিগত স্তরে রাহুল গান্ধীর প্রতি কিছুটা নরম মনোভাব থাকলেও, একজন পুরোদস্তুর রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর ধারাবাহিকতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন গুহ। তাঁর মতে, একজন জাতীয় নেতার যে ধরণের গভীরতা ও গাম্ভীর্য থাকা প্রয়োজন, রাহুলের মধ্যে তার অভাব স্পষ্ট। গুহ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাহুল গান্ধী হয়তো কোনও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে সুর চড়ালেন, সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র গুরুতর অভিযোগ আনলেন—কিন্তু ঠিক তার পরেই তিনি চলে গেলেন ইউরোপ বা ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমণে। এই যে ক্ষণস্থায়ী মনোযোগ এবং ধারাবাহিকতার অভাব, এটাই কংগ্রেসকে বারবার ডুবিয়েছে।
অথচ এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহরা বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টাই রাজনীতি করেন। গুহর মতে, একমাত্র ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র কয়েকটা মাস বাদ দিলে রাহুল গান্ধীকে কখনো সেই স্তরের নিবিড় ও কঠোর পরিশ্রম করতে দেখা যায়নি। বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বা ক্ষোভ প্রকাশ মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় সেইসব পোস্ট হয়তো কিছু লাইক বা শেয়ার পাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে বা বুথ স্তরের রাজনীতিতে তার কোনও স্থায়ী প্রভাব পড়ছে না।
রামচন্দ্র গুহ তাঁর নিবন্ধে মেনে নিয়েছেন যে বিজেপি সরকার দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, সংবাদমাধ্যমকে কোণঠাসা করেছে এবং তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু তাঁর মোক্ষম প্রশ্নটি হল—বিজেপির এই আগ্রাসী রাজনীতির মোকাবিলা করার জন্য যে ধরণের শক্তিশালী, দূরদর্শী এবং সার্বক্ষণিক বিরোধী নেতৃত্ব প্রয়োজন, তা কি গান্ধী পরিবার দিতে পারছে? উত্তরটা যে ‘না’, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষ যখন বিকল্প খোঁজে এবং সেখানে এক চরম শূন্যতা দেখতে পায়, তখন বাধ্য হয়েই তারা আবার নরেন্দ্র মোদির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গুহর এই লেখার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে—যাঁরা দেশে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ দেখতে চান, তাঁদের হয়তো এবার রাহুল গান্ধী বা গান্ধী পরিবারের মোহ কাটিয়ে নতুন বিকল্পের কথা ভাবার সময় এসেছে। কারণ, এই পারিবারিক একাধিপত্য আদতে মোদির হাতকেই আরও শক্ত করছে।















