আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে, ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী জনগণের আশঙ্কা প্রশমনের চেষ্টা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই এবং আতঙ্কিত হওয়ারও কোনও কারণ নেই।

'সিআইআই বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন ২০২৬'-এ বক্তব্য রাখার সময়, ভারতের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী জানান যে, প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামরিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত ও অটুট রয়েছে।

জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের জবাবে পুরী বলেন, "সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দিক থেকে কোনও সমস্যা নেই, কোথাও কোনও ঘাটতি নেই।"

ভারতের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ আছে: পুরী
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পুরি জানান, যেকোনও স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন বা সংকট মোকাবিলার জন্য ভারত পুরোপুরি প্রস্তুত এবং বর্তমানে এই দেশের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে। তিনি বলেন, "আমাদের কাছে ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুদ আছে, যা আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদার সমতুল্য। এছাড়া আমাদের কাছে ৬০ দিনের এলএনজি এবং ৪৫ দিনের এলপিজি-র মজুদ রয়েছে। সুতরাং, সরবরাহের দিক থেকে কোনও সমস্যা নেই।"

কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং প্রশ্ন তোলেন যে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হঠাৎ করে উদ্বেগ কেন এত বেড়ে গেল? একইসঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান যেন জ্বালানি সাশ্রয় বা সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারের বার্তাটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা না হয়।

পুরি প্রশ্ন রাখেন, "তাহলে গত দেড় দিন ধরে হঠাৎ করে এমন আতঙ্ক কেন সৃষ্টি হল? দয়া করে দেখুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসলে কী বলেছেন, আমরা যেন তাঁর বক্তব্যকে অযৌক্তিকভাবে বা বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা না করি।"

বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার এই সময়ে নাগরিকদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানের পরপরই মন্ত্রী পুরি এই মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী জনগণকে উৎসাহিত করেছেন যেন সম্ভব হলে তাঁরা গণপরিবহন ব্যবহার করেন, 'কারপুলিং'-এর মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে গাড়ি শেয়ার করেন এবং অপ্রয়োজনীয় পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে আনেন।

সরকারের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো ভারতের জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতের ফলে সৃষ্ট সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলার ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

খুচরা মূল্য স্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও চাপে তেল কোম্পানিগুলি
জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে বলে নাগরিকদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি, মন্ত্রী পুরি- তেল কোম্পানিগুলির ওপর চেপে বসা আর্থিক চাপের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং বলেন, "আপনি যদি আর্থিক পরিস্থিতির দিকে তাকান, তবে দেখবেন আমার অধীনস্থ তেল কোম্পানিগুলো প্রতিদিন ১,০০০ কোটি টাকা লোকসান গুনছে।" তিনি আরও জানান যে, জ্বালানি বিক্রয় বাবদ খরচের তুলনায় আয়ের ঘাটতি বা 'আন্ডার-রিকভারি'-এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেছেন, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দরের অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারত তার ভোক্তাদের জ্বালানির মূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধি থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে।

'এক্স'  প্ল্যাটফর্মে করা একটি পোস্টে পুরী উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের হাতেগোনা যে কয়েকটি দেশ গত চার বছর ধরে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ায়নি, ভারত তাদেরই অন্যতম। অথচ বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে।

পুরী লিখেছেন, "ভারতের জ্বালানি ভোক্তারা কোনও সংকটের মুখোমুখি নন। ভারতের জ্বালানি খাত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী।"

'গুজব ছড়ানো বন্ধ করুন,' পুরীর আহ্বান
ভারতের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যাকে 'অপ্রয়োজনীয় ভীতি ও জল্পনা' হিসেবে অভিহিত করেছেন, পুরী তারও তীব্র সমালোচনা করেছেন।
 তিনি বলেন, "যারা ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সংকট বা সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে উল্লাস করছেন, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হল- গুজব ছড়ানো বন্ধ করুন এবং এই নিয়ে রাজনীতি করা থেকে বিরত থাকুন।" 

পুরী জানান, যদিও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে (যা এমনকি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ওপরও প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে) তবুও ভারত পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে, ভারত এক লক্ষেরও বেশি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং ৩৩.৫ কোটি পরিবারে এলপিজি-র নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারত ২০০৬-০৭ সালে যেখানে মাত্র ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করত, বর্তমানে সেই সংগ্রহের পরিধি বাড়িয়ে ৪১টি দেশে বিস্তৃত করেছে। এর ফলে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় প্রভাবিত নয়, এমন সব রুট বা পথ দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বিশ্ব পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হওয়া সত্ত্বেও ভারত সর্বদা প্রস্তুত ছিল, আর জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় গৃহীত সুসমন্বিত পদক্ষেপগুলোর ফলেই সারা দেশে জ্বালানির সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।