আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরে এক স্বঘোষিত ধর্মগুর (যিনি স্থানীয়ভাবে "ভণ্ড বাবা" নামেই বেশি পরিচিত) বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক চিকিৎসার ছলে ২৮ বছর বয়সী এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভের আশায় ওই মহিলা ওই ধর্মগুরুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

নির্যাতিতার অভিযোগের ভিত্তিতে, অভিযুক্ত মহেশগিরি বাবা-র (যিনি মহেশ দিলীপ কাকড়ে নামেও পরিচিত) বিরুদ্ধে রাজ্যের 'কুসংস্কার বিরোধী আইন'-এর ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ওই মহিলা নাসিকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে কর্মরত। পারিবারিক সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে তাঁর বাবা-মা তাঁকে, ওই ধর্মগুরুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি পরিবারকে জানান যে, ওই মহিলার ওপর কোনও অশুভ আত্মা ভর করেছে। তিনি মহিলাকে "সুস্থ" করে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ধর্মগুরু মহিলাকে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রার্থনায় অংশ নিতে বলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর মোবাইল ফোনে ব্যক্তিগত ও অশ্লীল বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি ওই মহিলাকে একটি নির্জন স্থানে আসতে বলেন এবং সেখান থেকে তাঁকে গাড়িতে করে একটি লজে নিয়ে যান বলে অভিযোগ।

মহিলা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, অভিযুক্ত তাঁকে নিজের হাতের রুদ্রাক্ষ দেখিয়ে হুমকি দেন এবং বলেন, "আমার অলৌকিক ক্ষমতা আছে, তুমি কোনওভাবেই আমাকে বাধা দিতে পারবে না।" এরপরই তিনি জোরপূ করে ওই মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। এছাড়া তিনি ওই মহিলার নগ্ন ছবিও তুলেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে যে, পরবর্তীতে ওই মহিলা যখন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের কাছে এই ঘটনার কথা খুলে বলেন, তখন অভিযুক্ত তাঁর হুমকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি ওই মহিলাকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান, নিজেকে একজন "গুণ্ডা" হিসেবে দাবি করেন এবং পুলিশের কাছে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করে দেন। এছাড়া তিনি ওই মহিলার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন এবং নির্যাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বার্তা ও অন্যান্য প্রমাণ মুছে ফেলেন।

ভয়ের কারণে কিছুদিন চুপ থাকার পর, নির্যাতিতা সহায়তার জন্য কুসংস্কার বিরোধী সংগঠন 'অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি'-র দ্বারস্থ হন। এরপর মহারাষ্ট্র পুলিশের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। বর্তমানে এই ঘটনার তদন্ত চলছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি নাসিক শহরে অশোক খারাত নামের আরেক স্বঘোষিত ধর্মগুরুর বিরুদ্ধেও একই ধরনের একটি অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছিল। গত মার্চ মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক বিবাহিত মহিলা অভিযোগ করেছিলেন যে, ওই ব্যক্তি গত তিন বছর ধরে তাঁকে বারবার ধর্ষণ করেছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন-সহ আরও বেশ কিছু গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের 'মহারাষ্ট্র মানব বলিদান এবং অন্যান্য অমানবিক, কুপ্রথা ও কালোজাদু প্রতিরোধ ও নির্মূল আইন'-এর লঙ্ঘনের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত।

আকোলার 'স্বঘোষিত ধর্মগুরু'-র বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
মহারাষ্ট্রের আকোলায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনায়, চিকিৎসার ছলে শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করার অভিযোগে আরেক স্বঘোষিত ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে অভিযুক্ত চেতন সুনীল মুলে-র (যিনি "গুলাল শেষ মহারাজ" নামেও পরিচিত) কিছু উদ্বেগজনক কার্যকলাপ দেখা যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি শিশুদের দাঁত দিয়ে শূন্যে তুলে ধরছেন, পেরেক বসানো তলের ওপর বসিয়ে রাখছেন এবং তাদের দিয়ে বিপজ্জনক সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করাচ্ছেন।

অভিযুক্ত, প্রায় এক দশক ধরে এ ধরনের "দরবার" বা আসর বসিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করতেন যে, এর মাধ্যমে তিনি রোগ নিরাময় করতে পারেন, পারিবারিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং জীবনের নানা বাধা দূর করতে পারেন। ওই গ্রামের পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, সেখানকার মানুষ কুসংস্কারে গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ওই এলাকায় এ ধরনের আরও বেশ কয়েকজন "মহারাজ" বা ধর্মগুরু সক্রিয় রয়েছেন।

শিশু কল্যাণ সমিতির সদস্য প্রাঞ্জলি মনোজ জয়সওয়াল ইনস্টাগ্রামে একটি ভাইরাল 'রিল' (ভিডিও) দেখতে পাওয়ার পর এই মামলাটি গতি পায়। ওই ভিডিওতে শিশুদের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার পর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং সেই সূত্র ধরে মুর্তিজাপুর গ্রামীণ থানায় একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়।

পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৫ ধারা- 'কিশোর ন্যায়বিচার (শিশুদের যত্ন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৫'-এর ৭৫ ধারা (যা শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের সাথে সম্পর্কিত) এবং 'মহারাষ্ট্র কুসংস্কার বিরোধী আইন, ২০১৩'-এর ৩ ধারা। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এ ধরনের কার্যকলাপ শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

এই ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর, কর্তৃপক্ষ ওই অঞ্চলে এ ধরনের অন্যান্য কুপ্রথা ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকজন স্বঘোষিত ধর্মগুরুকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, অলৌকিক ক্ষমতার আড়ালে পরিচালিত এ ধরনের কোনও "দরবার" বা আসরকে আর বরদাস্ত করা হবে না।