আজকাল ওয়েবডেস্ক: পৌরভোটের ফলাফলে মহারাষ্ট্রের আকাশে ঘুড়ির জয়জয়কার। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) ২০২৬ সালের মহারাষ্ট্রের পৌরসভা নির্বাচনে ভাল ফল করেছে। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে সাম্প্রতিক জয়ের পর, আসাউদ্দিন ওয়েইসির দল মহারাষ্ট্রের পৌর রাজনীতিতে গুরুতর শক্তি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পেরেছে।

আসাদুদ্দিন ওয়ােইসির নেতৃত্বে এআইএমআইএম মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন পৌরসভায় ১২৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। যা কেবল তাদের প্রভাবকেই ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেনি, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকেও বদলে দিয়েছে।

এআইএমআইএম-এর আগের ফল:
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে, এআইএমআইএম কোনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি এবং এমনকী রাজ্যের একমাত্র এআইএমআইএম সাংসদ সৈয়দ ইমতিয়াজ জলিল-ও ছত্রপতি সম্ভাজিনগর থেকেপরাজিত হন।

সেই বছরের শেষের দিকে, মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে এআইএমআইএম-এর পারফরম্যান্সও তেমন দাগ কাটেনি। দলটি ১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র একটি আসনে জয়লাভ করেছিল। মালেগাঁও সেন্ট্রালে এআইএমআইএম প্রার্থী মুফতি মহম্মদ ইসমাইল আব্দুল খালিক মাত্র ১৬২ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

সমাজবাদী পার্টি, এনসিপি এবং কংগ্রেসের জন্য ধাক্কা:
সাম্প্রতিক পৌরসভা ও স্থানীয় সংস্থার ফলাফল সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটদানের ধরনে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ঐতিহ্যগতভাবে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং এনসিপি-র মাথাব্যথার কারণ।

বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত ওয়ার্ডে, এআইএমআইএম এই দলগুলোর সমর্থকদের নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে, বিশেষ করে ঔরঙ্গাবাদ এবং মালেগাঁওয়ে, যা ঘুড়ি প্রতীকের পেছনে মুসলিম ভোটের একত্রীকরণকে দেখায়।

ওয়েইসি ভাইদের প্রচারণার প্রভাব:
এই সাফল্যকে আসাদুদ্দিন ওয়েইসির নেতৃত্বে একটি নিবিড় প্রচারের ফলাফলও বলা যায়। আসাদউদ্দিনের ছোট ভাই আকবরউদ্দিন ওয়েইসি একদম নীচুস্তরের কর্মীদের সংগঠিত করেছেন। ৩ জানুয়ারি থেকে ১৩ জানুয়ারির মধ্যে, দুই ভাই ঔরঙ্গাবাদ, মালেগাঁও, নান্দেদ, নাগপুর এবং মুম্বাই জুড়ে কয়েক ডজন সমাবেশ ও জনসভায় ভাষণ দেন, যেখানে তাঁরা নাগরিক পরিষেবায় অবহেলা, প্রতিনিধিত্ব এবং পৌরসভা শাসনের উপর জোর দেন। যতটা সম্ভব বেশি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য এবং যতটা সম্ভব বেশি সমাবেশ করার জন্য, আসাদুদ্দিন ওয়েইসি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হেলিকপ্টারও ব্যবহার করেছেন। 

প্রচারের মূল বার্তা:

স্থানীয় হোন: আসাদুদ্দিন ওয়েইসি তাঁর বক্তৃতায় বারবার স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে ছিল অবহেলিত পরিকাঠামো, জল, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার ঘাটতি। তিনি ভোটারদের আশ্বাস দেন যে, এআইএমআইএম পৌর সংস্থাগুলিতে এই উদ্বেগগুলি ক্রমাগত তুলে ধরবে। তাঁর বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার, 'পায়ে হেঁটে ঘোরা' এবং ছোট ছোট জনসভা ভোটারদের এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে সরাসরি এলাকার প্রয়োজনের সঙ্গে মেলাতে সাহায্য করেছে।

অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে চলুন: ওয়েইসি তাঁর দলের নেতা ও কর্মীদের পূর্ববর্তী নির্বাচনের পরাজয়ের কথা মনে করিয়ে দেন এবং এবার আরও কঠোরভাবে চেষ্টা করার জন্য তাদের অনুপ্রাণিত করেন।

মহিলা ভোটার: ওয়েইসি তাঁর বক্তৃতায় ক্রমাগত মহিলাদের ভূমিকা ও সমর্থনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি ইসলামে নারীর ক্ষমতা তুলে ধরতে ধর্মীয় উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন এবং এআইএমআইএম প্রধান বিহারে কীভাবে মহিলা ভোটাররা দলকে জিতিয়েছিল তার উদাহরণও তুলে ধরেন।

অসন্তুষ্ট নেতাদের একত্রিত করা: আসাদুদ্দিন ওয়েইসি নিজেই এই বিষয়টি হাতে নেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে- দলের ভেতরের মতপার্থক্য দূর করা এবং দূরে সরে যাওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনা অভ্যন্তরীণ বিভেদকে নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করেছে।

আবু আজমি এবং ইমরান মাসুদের ওপর তীব্র আক্রমণ: তাঁর প্রচারের কিছু অংশে, বিশেষ করে পারভানিতে, ওয়েইসি কংগ্রেস এবং শিবসেনা-সমর্থিত গোষ্ঠী, সমাজবাদী পার্টি এবং আবু আজমির মতো মূলধারার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘুদের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য সমালোচনা করেন এবং ভোটারদের জবাবদি দাবি করার আহ্বান জানান।

আকবরউদ্দিন ওয়েইসির ভূমিকা: দল মুম্বই এবং ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে ব্যাপকভাবে আকবরউদ্দিন ওয়েইসিকে ব্যবহার করেছে। তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন এবং যুক্তি দেন যে- ঔরঙ্গাবাদের নাম পরিবর্তনের মতো ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের নাগরিক ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়, যা সরাসরি মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে।

আকবরউদ্দিন ওয়েইসি তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত অগ্নিগর্ভ বাগ্মিতার শৈলী ব্যবহার করেন। যা তার জনসমক্ষে তাঁর ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করে। আকবরউদ্দিনের এই আগ্রাসী বক্তৃতা প্রতিপক্ষের প্রতি তাঁর আক্রমণাত্মক অবস্থানকে আরও জোরদার করে।

ওয়েইসি ভাইদের প্রচার কৌশল এআইএমআইএম-কে শহুরে মহারাষ্ট্র জুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন জিততে সাহায্য করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে এআইএমআইএম-এর এই ফলাফল মহারাষ্ট্রে একটি প্রান্তিক শক্তি থেকে উদীয়মান শহুরে রাজনৈতিক শক্তিতে দলের রূপান্তরকে তুলে ধরেছে। এআইএমআইএম, কংগ্রেস ও এনসিপি-র শক্ত ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছে এবং প্রধান শহরগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে আসাদুদ্দিন ওয়েইসি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন রূপ দিয়েছেন, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ভবিষ্যতে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে পড়তে পারে।