আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের সংবিধান রচনা ছিল স্বাধীনতার পর নবগঠিত রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বৃহৎ ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব। স্বাধীনতা মিলেছিল, কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামো দেওয়া, নাগরিকের অধিকারকে আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা—এই বিশাল কাজটি একদিনে সম্ভব ছিল না। আজ আমরা সংবিধানের প্রধান নির্মাতা হিসেবে B. R. Ambedkar-কে যথাযোগ্য সম্মান দিই। কিন্তু আম্বেদকর চূড়ান্ত খসড়া গড়ে তোলার আগে, যিনি প্রথম পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি লিখেছিলেন এবং গোটা কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তিনি হলেন Sir Benegal Narsing Rau—সংক্ষেপে বি.এন. রাউ।

১৮৮৭ সালে ম্যাঙ্গালোরে জন্মগ্রহণ করেন রাউ। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও প্রগতিশীল; পিতা ছিলেন চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় মেলে। তিনি মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হন। এরপর পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে।

সেই সময় কেমব্রিজে অধ্যয়নরত ছিলেন জওহরলাল নেহরুও। নেহরু বাড়িতে চিঠি লিখে রাউকে “frightfully clever” বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন—রাউ প্রায় সারাক্ষণ পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকেন।

১৯১০ সালে রাউ ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (আইসিএস)-এ যোগ দেন। সে সময় এই পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত কঠিন; অল্প কয়েকজন ভারতীয়ই এতে উত্তীর্ণ হতে পারতেন। প্রশাসনিক জীবনে তিনি মূলত আইন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন। ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন—আইনের ভাষা কেবল শব্দ নয়; তা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে।

১৯৩৫ সালের Government of India Act 1935 কার্যকর হওয়ার পর উপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হয়। রাউ এই বিশাল আইনি পুনর্গঠনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দুই বছরেরও কম সময়ে বড় অংশ সম্পন্ন করেন। তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে।

&t=20s

পরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি হন। ১৯৪৪ সালে অল্প সময়ের জন্য তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রশাসনিক ও আইনি—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু স্বাধীন ভারতের নিজস্ব সংবিধান তখনও প্রণীত হয়নি। ২৯ আগস্ট ১৯৪৭-এ রাউকে গণপরিষদের সাংবিধানিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি গণপরিষদের সদস্য ছিলেন না, তবু তাঁর ওপরই অর্পিত হয়েছিল প্রাথমিক খসড়া তৈরির গুরুদায়িত্ব।

রাউ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও কানাডা সফর করেন। বিভিন্ন দেশের বিচারপতি ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তুলনামূলক সংবিধানচর্চার ভিত্তিতে তিনি মাত্র আট সপ্তাহে একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করেন। তাতে ছিল ২৪০টি অনুচ্ছেদ ও ১৩টি তফসিল। এটিই ছিল ভারতের সংবিধানের প্রথম সম্পূর্ণ রূপ।

এই খসড়াকেই ভিত্তি করে খসড়া প্রণয়ন কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন B. R. Ambedkar, বিস্তারিত আলোচনা ও সংশোধন করেন। পরবর্তীতে বহু পরিবর্তন আনা হলেও রাউয়ের নির্ধারিত কাঠামোই থেকে যায় মূল ভিত্তি হিসেবে।

রাউয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল নাগরিক অধিকারকে বাস্তবায়নযোগ্য করার প্রশ্নে। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন—যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তবে তারা যেন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারেন। এই ধারণাই পরবর্তীতে অনুচ্ছেদ ৩২ হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। আম্বেদকর একে সংবিধানের ‘হৃদয়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

প্রথম খসড়ায় রাউ “due process of law” শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন, যা আদালতকে বিস্তৃত ক্ষমতা দিত। যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি Felix Frankfurter-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফ্রাঙ্কফার্টার সতর্ক করেছিলেন—এই শব্দবন্ধ সামাজিক সংস্কারমূলক আইনকে আদালতের মাধ্যমে আটকে দিতে পারে।

রাউ সেই পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন এবং “procedure established by law” শব্দবন্ধ ব্যবহারের সুপারিশ করেন। শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনই সংবিধানে স্থান পায়, যা আইনসভা ও বিচারব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলে।

সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর রাউ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হন। ১৯৫২ সালে তিনি International Court of Justice-এর বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন—যা বিশ্ব আইনি অঙ্গনে অন্যতম উচ্চ মর্যাদার পদ।

তবু জনমানসে তাঁর নাম ততটা উচ্চারিত হয়নি। সংবিধান নিয়ে আলোচনা হলে রাজনৈতিক নেতাদের নামই বেশি সামনে আসে। ইতিহাসবিদ Granville Austin অবশ্য তাঁকে সংবিধান প্রণয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ১৯৫৩ সালে রাউ প্রয়াত হন। তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ—মঞ্চে বক্তৃতা নয়, কাগজ-কলমেই তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। হয়তো সেই কারণেই তিনি জনস্মৃতিতে আড়ালেই রয়ে গেছেন।

আজ যখন আমরা সংবিধানের মূল্য, মৌলিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলি, তখন Sir Benegal Narsing Rau-এর অবদান স্মরণ করা মানে সংবিধানের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়কে পুনরুদ্ধার করা। স্বাধীন ভারতের আইনি ভিত্তি নির্মাণে এই নীরব স্থপতির ভূমিকা আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে আরও সুস্পষ্টভাবে স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।