গোপাল সাহা

দেশের রাজধানী দিল্লি-সহ উত্তর ও পূর্ব ভারতের সিংহভাগ অংশ যেখানে চিকিৎসাগতভাবে গাফিলতির একটা বড় তথ্য প্রকাশ্যে আসছে। যার মধ্যে বেশকিছু অংশ অর্থাৎ রাজ্য কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে এবং যাদের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চারজন চিকিৎসাগত ভাবে প্রমাণিত নয়। বলাবাহুল্য, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে চিকিৎসা গত ভাবে ডাক্তারি নথিতে সঠিকভাবে কোন তথ্য নেই অর্থাৎ চিকিৎসক নিশ্চিত ভাবে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করেনি সরকারি নথিতে। 

বিখ্যাত বিজ্ঞানী সাময়িকী Scientific Report-এ প্রকাশিত একটি সর্বভারতীয় সমীক্ষায় উঠে এসেছে, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে ভারতে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুর হার মাত্র চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত ২২.৫ শতাংশ এবং প্রমাণিত নয় যার পরিমাণটা সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনের ১জন মাত্র চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত। এই পরিসংখ্যানটি বিশেষত দেশের রাজধানী দিল্লি-সহ ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল গুলিতে বেশি করে লক্ষ্যণীয়। বলাবাহুল্য এই সমস্ত রাজ্যগুলি যেখানে বিজেপি সরকার দ্বারা শাসিত অঞ্চল অর্থাৎ ডবল ইঞ্জিন সরকার বলে পরিচিত। ঠিক সেই সমস্ত অঞ্চলগুলি মূলত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো থেকে কয়েক  যোজন কিলোমিটার দূরে রয়েছে। 

পরিসংখ্যানগত তথ্য বলছে ভারতে মূলত দিল্লি সহ উত্তর ও পূর্ব ভারতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের (প্রায় ৮০%) মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হল চিকিৎসকের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হওয়া বা মেডিকেল সার্টিফিকেশন অব কজ অফ ডেথ (MCCD)-এর অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা ব্যবস্থার সুফল পেয়ে ওঠে না, যার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। এই তথ্যগুলি দিল্লি ও উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এই অঞ্চলগুলিতেই দেশের বিপুল জনসংখ্যার বাস। 

যেখানে কেন্দ্র সরকার অর্থাৎ বিজেপি সরকার বারবার বলছে তারা স্বাস্থ্যের দিক থেকে অনেক অনেক উন্নত এবং এগিয়ে। ঠিক সেই জায়গায় গবেষণার দিক থেকে যে তথ্য পরিসংখ্যান প্রকাশে এসেছে, তা সত্যি দেশের সার্বিক মানুষের জন্য একেবারেই হিতকর নয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, উত্তর ভারতে মৃত্যুর চিকিৎসা নিশ্চিতের হার  গড়ে মাত্র ১৩ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। অন্যদিকে দিল্লিতে এই হার বহু বছর ধরেই ৫৭–৫৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। ঘন হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ থাকা সত্ত্বেও সর্বজনীন কভারেজ থেকে এখনও অনেক দূরে। দিল্লিতে ৫৭%-৫৯% মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ উল্লেখ নেই।

ভারতে যেসব মৃত্যু চিকিৎসাগতভাবে ব্যাখ্যা পায় না -

৭৭.৫% মৃত্যুতে চিকিৎসাগত কারণের উল্লেখ নেই

মাত্র ২২.৫% মৃত্যু চিকিৎসক দ্বারা নির্ণয় রয়েছে

২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী:

মোট মৃত্যু: ৮.৮ মিলিয়ন (৮৮ লক্ষ)

চিকিৎসাগতভাবে মৃত্যু : ২ মিলিয়ন (২০ লক্ষ) নিশ্চিত হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক চিত্র:

উত্তর ভারত: ১৩% মৃত্যুর কারণ প্রমাণিত (সবচেয়ে খারাপ)

দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত: ৪০–৫৫%

কেন এই ব্যবধান?

দুর্বল রাজ্যগুলিতে মাত্র ৫০% বা তারও কম হাসপাতাল মৃত্যু রিপোর্ট করে।

এর গুরুত্ব কেন?

রোগ পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় নির্ধারণে বড় ধরনের বিকৃতি সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য কারণ জানা না থাকলে সরকার কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে পারে না। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, মাতৃ মৃত্যু, আঘাত কিংবা আত্মহত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলি সঠিকভাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় রোগের প্রকৃত বিস্তার বোঝা যায় না। এর ফলে রোগ-সংক্রান্ত হিসাব ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থ বরাদ্দে গুরুতর অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০২০ এই ১৫ বছর ধরে ভারতে মৃত্যুর চিকিৎসার  ধরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট। উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে এখনও এক অঙ্কের বা কম দুই অঙ্কের হার রয়ে গেছে, যার ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মৃত্যু চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা ছাড়াই থেকে যাচ্ছে।তুলনায় দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলি অনেক ভালো ফল করেছে, যার পেছনে হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর রিপোর্টিং ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়াই প্রধান কারণ।

একটি পৃথক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালে সারা দেশে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৪.৫ শতাংশ মানুষ মৃত্যুর সময় কোনও চিকিৎসা পরিষেবা পাননি। উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেন না কিংবা চিকিৎসা পান না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এই ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে অসুখ খুব গুরুতর নয়। অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও মৃত্যুর চিকিৎসাগত ঘাটতির প্রধান কারণ। 

কারণসমূহ:

১. পরিকাঠামোগত সংকট (Infrastructure Shortages)ও সীমিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র:
গ্রামীণ এলাকায় জনসংখ্যার তুলনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (PHC) ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র (CHC)-এর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কম।

২. গ্রাম–শহর বৈষম্য:
ভারতের মোট হাসপাতালের শয্যার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত, অথচ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন। বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার অধিকাংশই শহরকেন্দ্রিক।

৩. দুর্বল পরিকাঠামো:
বিদ্যমান বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ এবং কার্যকর অপারেশন থিয়েটারের মতো মৌলিক সুবিধার অভাব রয়েছে। এর ফলে পরিষেবার মান কমে যায় এবং মানুষ এই কেন্দ্রগুলির ওপর আস্থা হারায়।

৪. জনবল ঘাটতি (Manpower Deficiencies) ও যোগ্য চিকিৎসকের অভাব:
গ্রামীণ এলাকায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ (যেমন সার্জন, শিশু চিকিৎসক ইত্যাদি) এবং সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে।

অসম বণ্টন: উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সম্ভাবনার কারণে চিকিৎসকরা শহরমুখী হন, ফলে গ্রামে চিকিৎসা পরিষেবা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অপ্রশিক্ষিত (quack doctor) চিকিৎসকের উপর নির্ভরতা:
যোগ্য চিকিৎসকের অভাবে বহু মানুষ অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করান, যার ফলে ভুল রোগ নির্ণয় ও ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৫. সামাজিক-অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাধা ও (Socio-Economic and Geographic Barriers)
ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা: পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা, খারাপ রাস্তা এবং বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনোকে কঠিন করে তোলে।

৬. আর্থিক সীমাবদ্ধতা:
গ্রামীণ ভারতে অধিকাংশ স্বাস্থ্য খরচ মানুষকে নিজস্ব পকেট থেকেই বহন করতে হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কোনও স্বাস্থ্য বিমার আওতায় নেই, ফলে ব্যয়বহুল চিকিৎসা অনেকের নাগালের বাইরে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় ২৫% মানুষ কোনও  চিকিৎসকের পরামর্শই নেন না।

৭. সাংস্কৃতিক ও মানসিক কারণ: 
অনেক ক্ষেত্রে মানুষ প্রচলিত বা লোকাচারভিত্তিক চিকিৎসার উপর নির্ভর করেন, অথবা অসুখটিকে তেমন গুরুতর বলে মনে করেন না। এর ফলে আধুনিক চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং রোগের অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভারতে প্রায় ৮০-৮৫% মানসিক রোগী সঠিক সময়ে কোনও  চিকিৎসা পান না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা বা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে।

৮. বায়ুদূষণ: 
দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুদূষণ একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। ২০২৫-২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির মোট মৃত্যুর প্রায় ১৫% সরাসরি বায়ুদূষণের সাথে সম্পর্কিত। সহজ কথায়, মৃত্যুর কারণ সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়া এবং গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে না পারাই এই উচ্চ হারের প্রধান কারণ।   এই সকল কারণগুলির ফলে এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত নির্ণয় হয় না এবং বহু মৃত্যু কার্যত প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তা ঘটে চলেছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, দুর্বল চিকিৎসা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক বড় অন্ধকার দিক কারণ মানুষ কেন মারা যাচ্ছে তা না জানলে, তাদের বাঁচানোর উপায়ও ঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত

এই বিষয়ে আমরা সরাসরি কথা বলেছিলাম প্রখ্যাত চিকিৎসক যোগীরাজ রায় এর সঙ্গে। চিকিৎসক বলেন, "চিকিৎসা ব্যবস্থায় যে ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে মেডিকেল পোস্টমর্টেম বা প্যাথলজিকাল অটোপ্সি হয় না, যেটা হয় মেডিকো লিগাল পোস্টমর্টেম বা অটপ্সি। যার ফলে এই সমস্যাগুলো তৈরি হয়। বলাবাহুল্য, অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াগনোসিস করার আগেই রোগীর মৃত্যু হয়, তার ফলে এই সমস্যাগুলি বিপুল ভাবে দেখা যায় এবং শংসাপত্রে মৃত ব্যক্তির রোগের কারণ সঠিকভাবে উল্লেখ করে উঠতে পারে না চিকিৎসক। আবার অনেকে ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি মৃত্যু-শংসাপত্র (ডেথ সার্টিফিকেট) তৈরি করা হয় পারিপার্শ্বিক কিংবা ধর্মীয় কারণে। বলাবাহুল্য অনেক ক্ষেত্রেই মৃতদেহ পোড়ানো বা কবর দেওয়ার জন্য দেরি যাতে না হয় কিংবা পরিবারের মানসিক পরিস্থিতির কারণে মৃত্যু শংসাপত্র চিকিৎসকরা দিতে বাধ্য হয়।"

এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, "অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে ঠিকমতো রোগ নির্ণয় করার পূর্বেই রোগীর মৃত্যু ঘটে মুমূর্ষ রোগীর ক্ষেত্রে। সেক্ষেত্রে আবশ্যিক সেই মৃত ব্যক্তির প্যাথলজিকাল অটোপ্সি করে তারপর মৃত্যু শংসাপত্র প্রস্তুত করা। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে না কিংবা হয় না। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ক্ষেত্রে সারা ভারতবর্ষেই কোনও রাজ্য ততটা আজও এগিয়ে উঠতে পারিনি যে কোনও  কারনেই হোক। সেটা ধর্মীয় অথবা মানসিক দুর্বলতা যে কোনও কারণেই। ফলে দেশজুড়ে এই ধরনের ঘটনার পরিসংখ্যান সিংহভাগ।"