আজকাল ওয়েবডেস্ক: একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা কি আজও অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারে ডুবে রয়েছি? নাসিকের স্বঘোষিত ‘বাবা’ অশোক খরাতের ঘটনায় যে লোমহর্ষক তথ্য সামনে এসেছে, তা আমাদের সমাজের এক কুৎসিত এবং ভয়ংকর দিককে আবারও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে কীভাবে মহিলাদের ওপর চরম যৌন নিগ্রহ চালানো হয় এবং কীভাবে শিক্ষিত সমাজও এই মায়াজালে পা দেয়, খরাতের ঘটনা তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

অশোক খরাতের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাটা দীর্ঘ এবং শিউরে ওঠার মতো। ধর্ষণ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে যৌন হেনস্থা, জোর করে গর্ভপাত করানো, এমনকি খুনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে পুলিশের কাছে ৫০টিরও বেশি ফোন এসেছে, যেখানে মহিলারা ওই ভণ্ড বাবার লালসার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। কেউ জানিয়েছেন তোলাবাজির কথা, কেউ বা আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির কথা। 

দিল্লির বাসিন্দা ‘নীরু’ (নাম পরিবর্তিত) শেয়ার করেছেন তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে বাবা-মায়ের জোরাজুরিতেই তিনি এক ভণ্ড বাবার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। নীরুর কথায়, রাজস্থানের একটি মন্দিরে নিয়ে গিয়ে একজনের সামনেই তাকে আপত্তিকরভাবে শরীরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা হয় এবং অসভ্যভাবে স্পর্শ করে মন্ত্র জপ করা শুরু হয়। এর আগে বাস যাত্রার সময় ওই ভণ্ড সাধু তাকে ভয় দেখিয়েছিল যে, শরীরে অশুভ আত্মা থাকলে ‘চিকিৎসা’ করার জন্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে স্পর্শ করতে হবে। এই ঘটনা নীরুর মনে এতটাই গভীর ক্ষত তৈরি করেছে যে, আজও ভিড় বা পুরুষবেষ্টিত কোনও  জায়গায় তিনি আতঙ্কে কুঁকড়ে যান।

একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী ‘দীপিকা’ (নাম পরিবর্তিত)। উচ্চশিক্ষিত এবং সচ্ছল পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার বাবা তাকে দক্ষিণ দিল্লির এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়েছিলেন জনৈক স্বঘোষিত গুরুর কাছে। সেখানে সেই ভণ্ড সাধু ঘরের দরজা বন্ধ করে চিকিৎসার নামে তার গোপনাঙ্গে স্পর্শ করে। বাইরে বাবা বসে থাকলেও ঘরের ভেতরে চলা এই অপরাধের প্রতিবাদ করার সাহস পাননি দীপিকা, কারণ ভীতি ও সম্মোহন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। পরে সেই নরক থেকে বাঁচতে তিনি সুস্থ হয়ে যাওয়ার অভিনয় করতে বাধ্য হন।

তদন্তে দেখা গেছে, অনেক মহিলা বছরের পর বছর এই অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছেন। এই ভণ্ড সাধুরা প্রথমে মানুষের দুর্বলতা—যেমন অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা বা ব্যবসায়িক ক্ষতি—খুঁজে বের করে। তারপর ধীরে ধীরে তাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেয় যে, তাদের শরীরের ওপর যে অত্যাচার চলছে, তা আসলে কোনও  ‘স্বর্গীয় ক্রিয়া’ বা আশীর্বাদ। অনেক ক্ষেত্রে বাবা বা স্বামী নিজেই যখন পরিবারের কোনও  মহিলাকে ওই অপরাধীর হাতে সঁপে দেন, তখন ভুক্তভোগীর আর কোনও  আশ্রয়ের জায়গা থাকে না।

নাসিক হোক বা দিল্লি—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে এই ‘বাবা’রা নিজেরা শক্তিশালী নন। তাদের শক্তির আসল উৎস হলো সাধারণ মানুষের প্রশ্নহীন আনুগত্য এবং অন্ধবিশ্বাস। বিজ্ঞানের এই চরম উন্নতির যুগেও যখন মানুষ চিকিৎসকের চেয়ে জাদুটোনায় বেশি ভরসা করে, তখনই এই ধরনের অপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত হয়। অশোক খরাত আজ শ্রীঘরে ঠিকই, কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা এমন আরও অসংখ্য মুখোশধারী আজও সক্রিয়। যতদিন না মানুষ ভক্তি আর অন্ধবিশ্বাসের সূক্ষ্ম রেখাটা চিনতে শিখবে, ততদিন ধর্মের নামে এই লালসার কারবার চলতেই থাকবে।

নাসিকের এই স্বঘোষিত ‘বাবা’ অশোক খরাতের ঠাঁই ইতিমধ্যেই হয়েছে জেলের কুঠুরিতে। বুধবার নাসিক আদালত তাকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। তবে জেল থেকে এখনই মুক্তি পাওয়ার কোনও  সম্ভাবনা নেই খরাতের, কারণ তার বিরুদ্ধে জমা হওয়া একের পর এক যৌন হেনস্থার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) তাকে আবারও গ্রেপ্তার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রধান বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট বি.এন. ইচপুরানির এজলাসে তোলা হয় খরাতকে। সরকারি আইনজীবী শৈলেন্দ্র বাগাদে জানান, সিট-এর আবেদনের ভিত্তিতে আদালত তাকে জেল হেফাজতে পাঠিয়েছে। তবে অন্য একটি যৌন নির্যাতনের মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট বা ফের হেফাজতে নেওয়ার অনুমতিও মিলেছে।

গত ১৮ মার্চ খরাতকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল যখন ৩৫ বছর বয়সী এক মহিলা অভিযোগ করেন যে, গত তিন বছর ধরে ওই ভণ্ড সাধু তাকে বারবার ধর্ষণ করেছে। সেই ঘটনার পর সাহসে ভর করে আরও সাতজন মহিলা সামনে আসেন এবং একই রকম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। শুধুমাত্র যৌন লালসা নয়, প্রতারণার অভিযোগও কম নেই তার বিরুদ্ধে। পুণে ও অহল্যানগরের দুই ব্যবসায়ী এবং শিরডির এক চাষি খরাতের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা ঠকানোর অভিযোগ এনেছেন।

আদালত থেকে বের করে খরাতকে প্রথমে নাসিক সিভিল হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারপর পাঠানো হয় নাসিক সেন্ট্রাল জেলে। তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ২০২০ সাল থেকে এক বিবাহিত মহিলাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ এবং তাকে জোর করে গর্ভপাত করানোর যে অভিযোগ উঠেছে, সেই দ্বিতীয় মামলায় খুব শীঘ্রই খরাতকে নিজেদের হেফাজতে নেবে পুলিশ।

এদিকে, খরাতের পাশাপাশি এই জালিয়াতির কারবারে যুক্ত তার স্ত্রী কল্পনা এবং সহযোগী অশোক তাম্বে এখন ফেরার। শিরডি পুলিশ তাদের খোঁজে দুটি বিশেষ দল গঠন করেছে। পুলিশ খরাতের বাড়িতে তল্লাশি চালালেও কল্পনার হদিস মেলেনি। ইতিমধ্যেই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত কিরণ সোনওয়ানে এবং অরবিন্দ বাওকে নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি খরাতের ছেলেকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিল, যদিও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইনের জালে খরাত ধরা পড়লেও তার সঙ্গীদের ধরতে এখন মরিয়া তদন্তকারীরা।