আজকাল ওয়েবডেস্ক: সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নাগরিকদের প্রাণ হারানো একমাত্র দেশ ভারতই। হরমুজ প্রণালী ফের খুলতে ব্রিটেনের ডাকে ৬০ দেশের ভার্চুয়াল বৈঠকে জানিয়ে দিল নয়াদিল্লি। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার মূলনীতিগুলোর গুরুত্বের ওপরও জোর দিয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রক এমনই জানিয়েছে।
ভার্চুয়াল বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি। ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নেন। বিদেশ সচিব হরমুজ নিয়ে ফের ভারতের অবস্থানের কথা তুলে ধরে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হল কূটনীতি। বিদেশ মন্ত্রক জানায়, "এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হল উত্তেজনা প্রশমন এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে কূটনীতি ও আলোচনার পথে ফিরে আসা।"
বিদেশ মন্ত্রকের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'বিদেশ সচিব মিস্রি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই সংকট ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় এ দেশেরই এক নাবিকের মৃত্যু হয়েছে।'
ভারতের 'ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ শিপিং'-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে হামলার ঘটনায় অন্তত তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। তাঁরা সকলেই বিদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত ছিলেন।
ইরান ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে ভারত
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ যখন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করছিল, ঠিক সেই সময়েই ব্রিটেন এই বৈঠকের আয়োজন করে। বিদেশ মন্ত্রেকর তথ্য অনুসারে, সমুদ্রপথগুলো উন্মুক্ত রাখার লক্ষ্যে ভারতও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির, (যার মধ্যে ইরানও অন্তর্ভুক্ত) সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, "আমরা ইরান এবং ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, যাতে আমাদের জাহাজগুলোর জন্য বাধাহীন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায়টি আমরা খুঁজে বের করতে পারি।" তিনি আরও জানান যে, এই কূটনৈতিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই সুফল দিতে শুরু করেছে।
জয়সওয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, "গত কয়েক দিন ধরে আমরা যে আলোচনা চালিয়ে আসছি, তার সুবাদে ছ'টি ভারতীয় জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।" হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ আরোপের ক্ষেত্রে ইরান অত্যন্ত বাছ-বিচারমূলক নীতি অবলম্বন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও, জ্বালানি বহনকারী যেসব দেশের পণ্যবাহী জাহাজকে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ভারত সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বৈঠকে আমেরিকার অনুপস্থিতি
ব্রিটেনের আহ্বানে আয়োজিত এই বৈঠকে খোদ আমেরিকার কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার জেরে সৃষ্ট যুদ্ধের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই জলপথের নিরাপত্তা বিধান করা ওয়াশিংটনের দায়িত্ব নয় বলেই তিনি মনে করেন।
এই নেতা আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন। কারণ তারা এই যুদ্ধে সমর্থন জানায়নি। পাশাপাশি, তিনি তাঁর দেশকে 'নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন' (ন্যাটো) থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পুরোনো হুমকিটিও ফের দিয়েছেন।
ব্রিটেনের বিদেশ মন্ত্রী ইভেট কুপারের মতে, হরমুজ প্রণালী ফের উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে "আমাদের আন্তর্জাতিক সংকল্পের দৃঢ়তা" প্রদর্শন করাই ছিল এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকের শুরুতে তিনি বলেন, "আমরা দেখেছি, বিশ্বের অর্থনীতিকে স্থবির করার উদ্দেশ্যে ইরান কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল পথকে জবরদখল বা হাইজ্যাক করেছে।"
ব্রিটিশ বিদেশ মন্ত্রী আরও বলেন যে, তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম য়া বেড়েছে, তা "বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের পরিবার ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।" সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
















