আজকাল ওয়েবডেস্ক:  ডিসেম্বর ২০২৫-এ টানা তিন দিনের ভয়াবহ ফ্লাইট বিপর্যয়ের জন্য দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিল ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA)। এই ঘটনায় ইন্ডিগোর উপর মোট ২২.২০ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার সিইও-কে 'কশন', সিওও-কে 'ওয়ার্নিং' এবং সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (অপারেশনস)-কে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরও একাধিক শীর্ষ ও মধ্যস্তরের আধিকারিকের বিরুদ্ধেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

DGCA-র প্রেস নোট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্ডিগোর ২,৫০৭টি ফ্লাইট বাতিল হয় এবং ১,৮৫২টি ফ্লাইট মারাত্মকভাবে দেরি করে। এর ফলে তিন লক্ষেরও বেশি যাত্রী দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়েন। ব্যাপক ভোগান্তি ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের নির্দেশে DGCA একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্তে দেখা যায়, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল ইন্ডিগোর অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ‘ওভার-অপ্টিমাইজেশন’। বিমান, ক্রু ও নেটওয়ার্ক খাতে বেশি লাভ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় বিকল্প পরিকল্পনা রাখা হয়নি। সংশোধিত ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন (FDTL) নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ না  করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। শীতকালীন সূচি ২০২৫ চালুর আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ক্রু রোস্টার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে ডিউটির সময় বাড়ানো যায়। এর ফলে ডেড-হেডিং, টেল সুয়াপ ও দীর্ঘ ডিউটির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয় এবং রিকভারি মার্জিন কার্যত ন্যূনতম স্তরে নেমে আসে। এই পরিস্থিতি রোস্টারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং পুরো অপারেশনাল ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে যাত্রী পরিষেবার উপর।

এই প্রেক্ষাপটে DGCA ইন্ডিগোর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। সিইও-কে সামগ্রিক তদারকি ও সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য সতর্ক করা  হয়েছে। অ্যাকাউন্টেবল ম্যানেজার তথা সিওও-কে শীতকালীন সূচি ও সংশোধিত Flight Duty Time Limitation নিয়মের প্রভাব মূল্যায়নে ব্যর্থতার জন্য ওয়ার্নিং দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (অপারেশনস)-কে বর্তমান অপারেশনাল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে কোনও দায়িত্বশীল পদে না বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ডেপুটি হেড–ফ্লাইট অপারেশনস, AVP–ক্রু রিসোর্স প্ল্যানিং এবং ডিরেক্টর–ফ্লাইট অপারেশনস-সহ আরও কয়েকজন আধিকারিককে সতর্ক করা হয়েছে।

জরিমানার ক্ষেত্রেও DGCA কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন সিভিল অ্যাভিয়েশন রিকোয়ারমেন্টস (CAR) লঙ্ঘনের জন্য ইন্ডিগোর উপর এককালীন ১.৮০ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৬৮ দিন ধরে নিয়ম না মানার জন্য প্রতিদিন ৩০ লক্ষ টাকা  হারে জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, যার মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ২০.৪০ কোটি। সব মিলিয়ে জরিমানার পরিমাণ ২২.২০ কোটি টাকা।

DGCA জানিয়েছে, এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র শাস্তিমূলক নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় রুখতে একটি স্পষ্ট বার্তা। সংস্থার মতে, বাণিজ্যিক চাপ বা লাভের অজুহাতে যাত্রী স্বার্থ, ক্রু নিরাপত্তা এবং অপারেশনাল নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা যাবে না। ইন্ডিগোকে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামোগত সংস্কার, ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা তদারকি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে যাত্রীদের আর এমন ভোগান্তির শিকার হতে না হয়।