আজকাল ওয়েবডেস্ক: তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও কংগ্রেসের সম্পর্ক ভেঙেছে। এরপরই দিল্লিতে নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত।
এনডিটিভি-কে দেওয়া তথ্যে বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ডিএমকে ও কংগ্রেসের এই বিচ্ছেদের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি সংসদে নিজেদের শক্তি বা আসনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি সুযোগ খুঁজে পাচ্ছে। গেরুয়া শিবির এখন এই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে যে, কীভাবে এই দ্রাবিড়ীয় দলটিকে (ডিএমকে) জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে রাজি করানো যায়।
কী কারণে বিজেপির আশা বাড়ছে?
বিধানসভা ভোটে ডিএমকে-র সঙ্গে জোট বেঁধে লড়লেও ভোটের ফল বেরতোই স্ট্যালিনের হাত ছাড়ে কংগ্রেস। টিভিকে-কে সমর্থন করে তারা। ফলে বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ পাকা হয়। এরপরই ডিএমকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। কংগ্রেসকে, ডিএমকে 'পিঠে ছুরি মারা দল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রাক্তন জোটসঙ্গীর বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর করে ডিএমকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে। সেই চিঠিতে তারা সংসদে নিজেদের বসার আসন বিন্যাসে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। কারণ ডিএমকে চায় না, তাদের সাংসদরা সংসদে কংগ্রেসের সাংসদদের পাশে বসুন। বিভিন্ন সূত্র এনডিটিভি-কে জানিয়েছে যে, সম্পর্কের এই অবনতিই বিজেপি নেতৃত্ব আশারা আলো দেখছে। পদ্ম বাহিনীর নেতারা মনে করছেন, ডিএমকে হয়তো নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে তাদের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হতে পারে।
এছাড়াও, ডিএমকে-র রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার বিষয়টিও বিজেপি বিবেচনা করছে। বিশেষ করে বিধানসভা নির্বাচনে একটি নতুন দলের (টিভিকে) কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর স্ট্যালিনের দল এখন বেশ কোণঠাসা। সুপারস্টার বিজয়ের দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র হাতে কুক্ষিগত ছয় দশকের পুরনো 'দ্রাবিড়ীয় দ্বিপাক্ষিক আধিপত্য' ভেঙে দিয়েছে এবং রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে সাজিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি আঞ্চলিক দলের পক্ষে একই সময়ে রাজ্য এবং কেন্দ্র - উভয় স্তরেই বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা বেশ কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে বিজেপি-র বিভিন্ন সূত্রের ধারণা, ডিএমকে-কে কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে রাজি করানোটা হয়তো এখন অপেক্ষাকৃত সহজ হবে।
অতীতে ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোটে ছিল। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশ ছিল করুণানিধীর দল। পরে সেই মোর্চা ছেড়ে তারা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। তাই বিভিন্ন সূত্রের মতে, সেই পুরনো রাজনৈতিক সুসম্পর্ককে ফের জাগিয়ে তোলাটা মোটেও অসম্ভব নয়।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও 'সনাতন' সংক্রান্ত বাধা-বিপত্তি:
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ' পরিকল্পনার ডিএমকে বরাবরই একজন কঠোর বিরোধী। পুরো বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারকেই তারা এমন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সাজিয়েছিল, যাকে তারা অভিহিত করেছিল—"দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের ওপর বিজেপির আঘাত" হিসেবে। ডিএমকে-র সাংসদরা কালো কাপড় পরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল'-এর প্রতিলিপি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমকে স্টালিন নেতৃত্বাধীন দলটির পক্ষে এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান নরম করা সহজ হবে না।
আরেকটি জটিল বিষয় হল সনাতন ধর্ম প্রসঙ্গে ডিএমকে-র অবস্থান। এই ইস্যুতে স্ট্যালিনের দল বার বার বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। প্রাক্তন উপ-মুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্টালিনের সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে বারবার করা মন্তব্য দীর্ঘকাল ধরে বিজেপি ও ডিএমকে-কে মুখোমুখি সংঘাতের অবস্থানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। উভয় পক্ষের জন্যই এই পরিস্থিতি সামলানো একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে।
সংখ্যার খেলা:
বিজেপির আশা মূলত এই সম্ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে যে, সংসদে নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে ডিএমকে তাদের সমর্থন জানাবে। এক্ষেত্রে প্রকৃতঅর্থে গুরুত্ব পাবে কেবল 'সংখ্যা' বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সংসদে 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ' সংক্রান্ত ভোটাভুটির সময়, বিলটি পাশ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপি অর্জন করতে পারেনি। সংসদে ৩৬২ আসনের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যমাত্রা থেকে এনডিএ এখনও ৭০টি আসন পিছিয়ে রয়েছে। লোকসভায় ডিএমকে-র ২২ জন সাংসদ ভবিষ্যতে এনডিএ-কে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারেন।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত ভোটাভুটির সময়, এনডিএ ২৯৮টি ভোট পেয়েছিল, অন্যদিকে তাদের বিপক্ষে ভোট পড়েছিল ২৩০টি। যেহেতু ভোটাভুটির সময় সংসদে মোট ৫২৮ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন, তাই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যমাত্রা ৩৫২ থেকে এনডিএ ৫৪টি ভোট কম পেয়েছিল। ডিএমকে-র ২২ জন সাংসদ বিরোধী শিবিরের সাথে একজোট হয়ে বিলটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
দলীয় সূত্রের খবর, বিজেপি এখন ডিএমকে-র সঙ্গে এমন এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলার আশা করছে, যা নবীন পট্টনায়েকের 'বিজু জনতা দল' , জগন রেড্ডির 'ওয়াইএসআরসিপি' এবং কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের 'বিআরএস' -এর মতো দলগুলির সম্পর্কের মতোই। এই দলগুলি এনডিএ-র বাইরে হলেও, নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে কেন্দ্রের (অর্থাৎ বিজেপির) প্রতি সমর্থন জানিয়ে থাকে।
এআইএডিএমকে-র ভাঙন:
নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর, তামিলনাড়ুতে বিজেপির জোটসঙ্গী দল 'এআইএডিএমকে'-র অন্দরে যে বিদ্রোহ দানা বেঁধেছে, তা বিজেপিকে বাধ্য করেছে এই দলটির বাইরে গিয়ে বিকল্পের সন্ধান করতে। দলীয় সূত্রের মতে, এআইএডিএমকে দলটি এখন ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আর এআইএডিএমকে-র উভয় অংশকেই নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কেন্দ্রের (অর্থাৎ বিজেপির) সমর্থনের প্রয়োজন হবে। এই অবস্থায়, স্ট্যালিনের দল যদি সামান্যতম আগ্রহও প্রকাশ করে, তবে ডিএমকে-র আরও কাছাকাছি পৌঁছানোটা বিজেপির জন্য খুব একটা কঠিন হবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত হিসাব:
আগামী বছর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারিত রয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে বিশাল জয়ের সুবাদে বিজেপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তবুও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব দলীয় নেতৃত্বের চিন্তার কারণ হয়েই আছে। বিজেপি সূত্রের খবর, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডিএমকে-র সমর্থন আদায়ের সুযোগটি কাজে লাগানোর বিষয়টি নিয়ে বিজেপি এখন সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে।
শাসক শিবিরের আসনসংখ্যা বা শক্তি বৃদ্ধি করা ছাড়াও, ডিএমকে যদি নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে বিজেপিকে সমর্থন জানায়, তবে তা বিরোধী শিবিরকে আরও বেশি ছত্রভঙ্গ বলে তুলে ধরবে। যা বিজেপির জন্য বাড়তি ভাবমূর্তির বিষয় হবে।















