আজকাল ওয়েবডেস্ক: সংসার চালানোর বা স্ত্রীকে খোরপোশ দেওয়ার দায় থেকে স্বামী কেবল এই অজুহাতে হাত ধুয়ে ফেলতে পারেন না যে, তাঁর কোনও  স্থায়ী রোজগার নেই। সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এই কড়া পর্যবেক্ষণ জুডিশিয়াল বেঞ্চের। দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি সৌরভ ব্যানার্জি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকার অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব কোনওভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়।

ফ্যামিলি কোর্টের একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন দাখিল করেছিলেন এক ব্যক্তি। সেখানে নিম্ন আদালত ওই ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছিল, স্ত্রী এবং দুই মেয়ের প্রত্যেকের জন্য প্রতি মাসে ১১,০০০ টাকা করে খোরপোশ দিতে হবে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে স্বামী সওয়াল করেন যে, তিনি কোনও  স্থায়ী চাকরি করেন না, সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন যার ফলে তাঁর আয় অনিশ্চিত। এছাড়াও তিনি যক্ষ্মা (TB), ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগ সহ একাধিক জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, তাঁর ওপর বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ব রয়েছে এবং মাথার ওপর মোটা অঙ্কের লোণের বোঝাও রয়েছে। পাশাপাশি স্বামীর আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর স্ত্রী একজন কমার্স গ্র্যাজুয়েট এবং অতীতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজও করেছেন, ফলে তিনি নিজেই নিজের ভরণপোষণ করতে সক্ষম।

পাল্টা জবাবে স্ত্রীর পক্ষে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয় যে, স্বামীর অসুস্থতা, আর্থিক অনটন বা ঋণের যে সমস্ত খতিয়ান এখন তুলে ধরা হচ্ছে, তার কোনওটিই ফ্যামিলি কোর্টে মূল শুনানির সময় বলা হয়নি। আইনি নিয়ম অনুযায়ী, রিভিশন পিটিশনের শুনানিতে হুট করে প্রথমবারের জন্য এই ধরনের নতুন যুক্তি আমদানি করা যায় না।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি সৌরভ ব্যানার্জি জানান, রিভিশন এক্তিয়ারে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং ফ্যামিলি কোর্টের রায়ে কোনও  আইনি ত্রুটি নেই। আদালত সাফ জানায়, স্ত্রী নিজের খরচ চালাতে সক্ষম—এমন কোনও  সুনির্দিষ্ট প্রমাণ স্বামী আদালতে পেশ করতে পারেননি। স্বামীর 'রেগুলার সোর্স অফ ইনকাম নেই'—এই যুক্তি খারিজ করে আদালত 'ভুবন মোহন সিং বনাম মীনা (২০১৫)' এবং 'অঞ্জু গর্গ বনাম দীপক কুমার গর্গ (২০২২)' মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের উল্লেখ করে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, স্ত্রী ও নাবালক সন্তানদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া একজন স্বামীর অলঙ্ঘনীয় এবং পবিত্র কর্তব্য (Sacrosanct Duty)। প্রয়োজনে শারীরিক পরিশ্রম বা দিনমজুরি করেও স্বামীকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তাছাড়া আদালত খতিয়ে দেখে যে, স্বামীর নিজের পেশ করা নথিতেই স্পষ্ট তিনি একজন কারিগরি বিশেষজ্ঞ (Technical Expert) এবং অতীতে মোটা অঙ্কের বেতন পেতেন। ২০২১ সালের স্যালারি স্লিপ অনুযায়ী তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৪০,০০০ টাকা। এমনকি তাঁর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টেও বারবার বড় অঙ্কের টাকা ক্রেডিট হওয়ার প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে একটি এন্ট্রি ছিল প্রায় ৬০,০০০ টাকার। সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে দিল্লি হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়, ফ্যামিলি কোর্টের দেওয়া প্রতি মাসে ১১,০০০ টাকার খোরপোশের নির্দেশ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং স্বামীর পুনর্বিবেচনার আবেদনটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দেওয়া হল।