আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'আরশোলা জনতা পার্টি' বা 'ককরোচ জনতা পার্টি', সব ছাপিয়ে বর্তমানে এই পার্টি ঘিরেই চর্চা তুঙ্গে। মাত্র পাঁচ দিন আগে অনলাইনে যাত্রা শুরু করা 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন তথা বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপি-কেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।
যদিও সমালোচকরা 'ককরোচ জনতা পার্টি'-কে নিছকই একটি 'সোশ্যাল মিডিয়া গিমিক' বা প্রচারের কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে, প্রাথমিক সদস্যসংখ্যার বিচারে দলটি বিজেপির চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে। অনলাইনে এটি অভাবনীয় সাড়া জাগাতে পেরেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু'জন সাংসদ ইতিমধ্যেই এই দলে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নতুন এই দলের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে রাজ্য-ভিত্তিক শাখা বা ইউনিট গড়ে উঠেছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে বহু মানুষ। বর্তমানে আমেরিকার বোস্টন শহর থেকে 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র কার্যক্রম পরিচালনা করছেন অভিজিৎ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে, ঠিক তখনই বৃহস্পতিবার ভারতে এই দলের 'এক্স' অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা 'উইথহেল্ড' করে দেওয়া হয়।
এমন পরিস্থিতিতে, স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে যে- সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমবর্ধমান অনুসারী এবং হাজার হাজার সদস্য থাকার দাবি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী 'ককরোচ জনতা পার্টি' কি আরশোলা প্রতীকটি নিয়ে নির্বাচনে লড়তে পারবে, যা দলটির নামকরণের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে? 'ককরোচ জনতা পার্টি' তাদের 'এক্স' অ্যাকাউন্টের একটি পোস্টে জানিয়েছিল যে, 'মোবাইল ফোন' হবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, দলটি যদি আরশোলাকেই তাদের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে দাবি করে, তবে তারা কি আদৌ তা পাবে?
এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হল- হ্যাঁ, তবে বিষয়টি মোটেও সহজ হবে না।
প্রথমে জানা যাক যে- ভারতে নির্বাচনী প্রতীক কে বা কারা বরাদ্দ করেন এবং সেই প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন?
নির্বাচন কমিশনের 'মুক্ত প্রতীকের' তালিকায় নেই আরশোলা
ভারতে নির্বাচনী প্রতীক সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়মকানুন নিয়ন্ত্রণ করে 'ভারতের নির্বাচন কমিশন'। প্রথমত, 'ককরোচ জনতা পার্টি'-কে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের দল হিসেবে নথিভুক্ত করাতে হবে।
নথিভুক্ত কিন্তু নির্বাচন কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত নয়, এমন রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণত নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত একটি নির্দিষ্ট তালিকা থেকে 'মুক্ত প্রতীক' বেছে নিতে হয়। তবে সমস্যা হল, নির্বাচন কমিশনের এই তালিকাটি বেশ পুরনো এবং সেকেলে। আর দলটির কাঙ্ক্ষিত প্রতীক (মোবাইল ফোন) সেই তালিকার ১০০টিরও বেশি প্রতীকের মধ্যে কোথাও স্থান পায়নি।
দলটি চাইলে তাদের পছন্দমতো কোনও নতুন প্রতীকের প্রস্তাব পেশ করতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ বা শর্ত মেনে চলতে হয়। সেই শর্তগুলোর মধ্যে একটি শর্ত 'ককরোচ জনতা পার্টি'-এর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রণীত "নির্বাচনী প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮ (২০১৬ সালে সংশোধিত)" অনুযায়ী, এমন কোনও নতুন প্রতীকের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় না, যা "কোনও পাখি বা পশুকে" চিত্রিত করে।
তাই কোনও দলের নাম হয়তো 'ককরোচ জনতা পার্টি' হতে পারে, কিন্তু ব্যালট বা ইভিএম-এ একটি আরশোলার ছবি প্রতীক হিসেবে পাওয়াটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় হতে পারে।
দলীয় প্রতীক সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন কী বলে?
ভারতে নির্বাচনী প্রতীকসমূহ 'নির্বাচনী প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮' দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আদেশটি প্রতীকগুলোকে দু'টি শ্রেণিতে বিভক্ত করে। "সংরক্ষিত" এবং "মুক্ত"। সংরক্ষিত প্রতীকগুলো একান্তভাবেই স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর মালিকানাধীন থাকে। যেমন- বিজেপির 'পদ্ম' বা আম আদমি পার্টির 'ঝাড়ু'।
এগুলো ছাড়াও, আরও প্রায় ১০০টি প্রতীকের একটি তালিকা রয়েছে যাকে নির্বাচন কমিশন "মুক্ত" প্রতীক হিসেবে অভিহিত করে। তালা-চাবি, এয়ার কন্ডিশনার, ল্যাপটপ, দাবা বোর্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা, নখ কাটার যন্ত্র (নেইল কাটার)- এমন সব প্রতীক অন্যান্য প্রার্থী ও দলগুলোকে বরাদ্দের জন্য উন্মুক্ত থাকে। সাধারণত নির্দল প্রার্থীদের জন্য এই প্রতীকগুলোই বেছে নেওয়া হয় এবং বরাদ্দ করা হয়।
নির্বাচন কমিশন পর্যায়ক্রমে এই মুক্ত প্রতীকগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মাবলি অনুযায়ী, অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা এই বিজ্ঞাপিত মুক্ত প্রতীকগুলোর মধ্য থেকেই নিজেদের প্রতীক বেছে নেন।
'ককরোচ জনতা পার্টি' কি 'আরশোলা' প্রতীকটি চাইতে পারে?
এর প্রথম ধাপটি হবে নির্বাচন কমিশনের কাছে দলটিকে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নথিভুক্ত করা। প্রযুক্তিগতভাবে, একটি নথিভুক্ত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল তাদের সাধারণ প্রতীক হিসেবে বিবেচনার জন্য নিজেদের পছন্দমতো সর্বোচ্চ তিনটি নতুন প্রতীকের প্রস্তাব পেশ করতে পারে। এই প্রস্তাবের সঙ্গে প্রতীকের নকশা ও ছবিও জমা দিতে হয়।
'প্রতীক আদেশ'-এ বলা হয়েছে যে, যদি কোনও প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে "কোনও আপত্তি না থাকে", তবে কমিশন সেই প্রতীকগুলো "বিবেচনা করে দেখতে পারে"।
তবে, একই বিধানে প্রস্তাবিত প্রতীকের ধরনের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, নতুন প্রস্তাবিত প্রতীকগুলোর সঙ্গে "বিদ্যমান সংরক্ষিত বা মুক্ত প্রতীকগুলোর কোনও সাদৃশ্য থাকা চলবে না; পাশাপাশি সেগুলোর কোনও ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক তাৎপর্য থাকা যাবে না এবং কোনও পাখি বা পশুর ছবিও তাতে থাকতে পারবে না"।
তবে, নির্বাচন কমিশন 'আরশোলা'-কে একটি "পশু" হিসেবে গণ্য করবে, নাকি কেবল একটি 'কীটপতঙ্গ' হিসেবে দেখবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ওই নির্দিষ্ট বিধানটিই সম্ভবত 'আরশোলা' প্রতীক পাওয়ার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আরশোলা যেহেতু একটি প্রাণী, তাই এর ছবি সম্বলিত কোনও প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে বাতিল হয়ে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পশুর প্রতীকগুলো সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বহুজন সমাজ পার্টি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো পুরোনো ও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলির যথাক্রমে তাদের 'হাতি' এবং 'সিংহ' প্রতীক এখনও বহাল রেখেছে।
'মোবাইল ফোন' প্রতীকটি- যা 'ককরোচ জনতা পার্টি' তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে পেতে আগ্রহী, নির্বাচন কমিশনের ১০০টিরও বেশি 'মুক্ত প্রতীক'-এর তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়; যদিও দলটি এই প্রতীকটির প্রতি তাদের পছন্দের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে রেখেছে। মুক্ত প্রতীকের তালিকায় ল্যান্ডলাইন ফোন এবং মোবাইল চার্জার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, মোবাইল ফোন নেই।
ভারতে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে প্রাণীদের ব্যবহার কেন নিরুৎসাহিত করা হয়?
দলীয় প্রতীক হিসেবে "প্রাণী"-র ব্যবহারের ওপর এই বিধিনিষেধ নতুন কিছু নয়। 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর ২০০৮ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, প্রাণী অধিকার কর্মীদের আপত্তির মুখে ১৯৯১ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রাণীদের প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ করা বন্ধ করে দেয়। ওই কর্মীরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, নির্বাচনী প্রচারেরর সময় অনেক ক্ষেত্রে ওইসব প্রাণীদের মিছিলে ঘোরানো হত এবং তাদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করা হত।
২০১২ সালে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাণী ও পাখি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। ২০১২ সালে 'দ্য হিন্দু' পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন জানিয়েছিল যে, যদি প্রাণীদের ব্যবহার অপরিহার্য হয়েই পড়ে, তবে দলগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনও আইন লঙ্ঘন না হয় এবং প্রাণীদের ওপর কোনও প্রকার নিষ্ঠুর আচরণ করা না হয়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যে, প্রাণী অধিকার কর্মীদের উত্থাপিত উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন কার্যত নতুন করে কোনও প্রাণী বা পাখির প্রতীক বরাদ্দ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কেবল হাতেগোনা কয়েকটি পুরনো বা ঐতিহ্যবাহী প্রতীকই এর ব্যতিক্রম হিসেবে টিকে আছে। যেম- বিএসপি-এর 'হাতি' এবং ফরোয়ার্ড ব্লক-এর 'সিংহ'।
অন্য কথায়, পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ঐতিহাসিকভাবে বরাদ্দকৃত প্রাণী-ভিত্তিক প্রতীকগুলো ব্যবহার অব্যাহত রাখতে পারলেও, নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হয়।
একটি নতুন দলকে কি নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত কোনও প্রতীকই ব্যবহার করতে হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উত্তর হল- হ্যাঁ। নির্বাচন কমিশন ১০০টিরও বেশি 'মুক্ত প্রতীক'-এর একটি বিশাল তালিকা বা ক্যাটালগ রক্ষণাবেক্ষণ করে, যেখান থেকে অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলি তাদের পছন্দের প্রতীক বেছে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। যদি একাধিক দল একই প্রতীকের দাবি জানায়, তবে প্রতীক বরাদ্দের বিষয়টি 'আগে এলে আগে পাবেন' ভিত্তিতে, অথবা ক্ষেত্রবিশেষে লটারির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা কমিশনের হাতেই থাকে, এমনকি কোনও দলের পছন্দের প্রতীকটি যদি উপলব্ধ না থাকে, তবে কমিশন তাদের অন্য কোনও 'মুক্ত প্রতীক' বরাদ্দ করতে পারে।
'ককরোচ জনতা পার্টি'-র প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। বর্তমানে দলটির জনপ্রিয়তা মূলত সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে তাদের 'প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমালোচনামূলক হাস্যরস' এবং গতানুগতিকতার বাইরের অভিনব প্রচারশৈলী অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দলটি শেষমেশ একটি 'গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে' রূপান্তরিত হতে পারবে কি না, তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।
যদি দলটি সেই পথে এগোয়, তবে তাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে 'জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১'-এর ২৯এ ধারার অধীনে নিজেদের নথিভুক্ত করা। নথিভুক্ত কিন্তু নির্বাচন কমিশন কর্তৃক 'স্বীকৃতিহীন' রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে এবং কমিশনের নিয়মাবলি সাপেক্ষে একটি অভিন্ন প্রতীকের জন্য আবেদন করতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে 'ককরোচ জনতা পার্টি' জানিয়েছিল যে, একটি 'মোবাইল ফোন' হবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক। কিন্তু দলটি যদি এমন আশা করে থাকে যে, ভোটযন্ত্রে তাদের প্রার্থীদের নামের পাশে একটি 'আরশোলার' ছবি থাকবে- তবে এক্ষেত্রে প্রচলিত আইন হয়তো তাদের পক্ষে থাকবে না। আবারও বলা যায়, এই ক্ষেত্রে 'তেলাপোকা' প্রতীকটি সম্পর্কে কমিশন কী ব্যাখ্যা দেয়, তা-ই হবে মূল নির্ণায়ক বিষয়। তবে একথা বলাই বাহুল্য যে, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত প্রতীকের তালিকায় অদূর ভবিষ্যতে 'আরশোলা'র স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।















